যশোর জেলা সম্পর্কে প্রাচীন ইতিহাসে উল্লেখ আছে, 'যশোরাদ্য দেশ: কানন কুস্ত লা'। এর সহজ অর্থ দাঁড়ায়, যশোর জনপদটি জঙ্গলবেষ্টিত। আর এই জঙ্গল বা প্রাচীন বনের নাম ছিল 'কালকবন'। হাজার হাজার বছরের ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জনার ফলে যশোর এলাকা জঙ্গলমুক্ত হয়েছে। আর কালকবনটির নাম হয়েছে এখন সুন্দরবন। যশোরভূমির সীমানার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বনটি পিছিয়ে গেছে দূরে। আজকের বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার অংশ বিশেষ, খুলনা জেলা, বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার অংশ বিশেষ, ভারতের চব্বিশ পরগনা জেলার অংশ বিশেষ, বৃহত্তর বরিশাল জেলার অংশ বিশেষ, দেশ বিভাগ কালেও (১৯৪৯) যশোর জেলার সীমানার মধ্যে ছিল। আজ দেখা যায়, মহানগরী কলকাতা থেকে যশোর রোড শুরু হয়ে এসেছে যশোর শহরে। সেটি আবার এগিয়ে গিয়েছে খুলনা মহানগরী ভেদ করে লোয়ার যশোর রোড নাম নিয়ে। এই যশোর ভূ-খণ্ডের কয়েকটি নদীর নাম মহাভারতেও উল্লেখ রয়েছে। উল্লেখ হয়েছে গ্রিসের প্রাচীন ইতিহাসেও। এরপর মৌর্য সাম্রাজ্যের অংশ ছিল যশোর। পাল, সেন, সুলতানি, মুঘল, কোম্পানি, ইংরেজ, পাকিস্তানি শাসন ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর যশোর বরাবরই ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাচীন সংস্কৃতির লীলাভূমি। সম্প্রতি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র যশোর জনপদকে প্রশাসনিক কারণে আবারো বিভাজন করা হলো। যশোর জেলাকে রূপান্তরিত করা হয়েছে ৪টি জেলায়। এগুলো হলো—যশোর সদর, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও নড়াইল। যশোরবাসী প্রশাসনিক কারণে এই বিভাজন স্বীকার করলেও তারা যশোরের সংস্কৃতির অভিজ্ঞতায় বিশ্বাসী। ঐক্যের মধ্যে নিজসত্তাকে লালন করতে অধিকতর আগ্রহী। প্রাচীনকাল থেকে অসংখ্য জাতিগোষ্ঠী বিচিত্র ধর্মীয় মতবাদ, যুদ্ধবিগ্রহ, রাষ্ট্র বিপ্লব, ধ্বংস, নির্মাণ, কালিক পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের বহু বর্ণিল ইতিবৃত্ত ধারণ করে যশোর জেলা উপমহাদেশের সংস্কৃতির ইতিহাসে আজও উজ্জ্বলতর একটি প্রাচীন জনপদ। বাঙালি মানসে যশোর এক সার্বজনীন কিংবদন্তি। এই যশোরের স্বপ্রিল প্রকৃতির মধ্যে আমি ভূমিষ্ঠ হয়েছি। সেই বালক বয়সেই যশোরের পরিপ্রকৃতি আমাকে যেমন আকৃষ্ট করে, তেমনি এর শ্রুতিগ্রাহ্য শব্দ, সুর আর গুঞ্জন আমাকে মোহাবিষ্ট করে রাখে। এইভাবে নিজ জন্মভূমি থেকে শুরু করে সারা বাংলাদেশের প্রকৃতির মধ্যে শুনতে পেয়েছি সঙ্গীত। পেয়েছি বিচিত্র সব রাগ অনুরাগের বিপুল স্পর্শ।
একসময় ভেতরের অনুপ্রেরণায় আর বিপুল যুগ্ধতায় কবিতা ও সঙ্গীত নির্মাণে এগিয়ে এলাম। এ হলো আমার চিত্রকর্ষের বহিঃপ্রকাশ। সেই কিশোরবেলা (১৯৬৭) থেকে শুরু করে প্রচলিত সঙ্গীতের গান বা কথা লিখতে শুরু করি। সেও কম দিনের কথা নয়। মুগ্ধতার শেষ কোথায়। গানগুলো সাজাতে থাকলাম কথকের নাম, ঠিকানা, বয়স, সংগ্রহের সাল ইত্যাদি উল্লেখ করে। এইভাবে দেশের প্রচলিত গীত ও পরিচিত এবং অপ্রকাশিত প্রায় সর্বশ্রেণির লোকসঙ্গীতের কথার ডালা সাজিয়ে ফেললাম। সেই সঙ্গে প্রতি শ্রেণির গানের ওপর টুকরো টুকরো আলোচনা বাংলাদেশের লোক গীতি সম্ভার গ্রন্থে স্থান পেয়েছে সেই সঙ্গে ৬৮ শ্রেণির গান। গানগুলো যেমন শুনেছি তেমন লিখেছি। কোনো পরিবর্তন করিনি। আমার ধারণা, লোকসঙ্গীত সংগ্রহের এটা একটি ব্যতিক্রমী গ্রন্থ। এবং এত অধিক শ্রেণির লোকগীতি কোনো গ্রন্থে স্থান পেয়েছে বলে মনে করি না। এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে এমন সব গান, যা পাঠক-গবেষকদের জানবারও বাইরে। জারি, সারি, ভাব, ভাটিয়াল, কবি, ধুয়া প্রভৃতির সংগ্রহই শুধু নয়, সেখানে স্থান পেয়েছে হাবইডগান, পটেরগান, পাটোইর গান, গোষ্ঠ, সয়লা, মালসি, সখি সংবাদ, টপ্পা সঙ্গীতের গীতিসমূহ। গ্রন্থটি প্রমাণ করবে, আমাদের লোকসঙ্গীতের ভুবন কত সমৃদ্ধ।
এই সংগ্রহের যারা কথক তাদের নাম গ্রন্থে যথাযথস্থানে উল্লেখ করেছি। তাদের অনেকেই পৃথিবীর আলো-বাতাস ত্যাগ করেছেন। আবার কেউ কেউ জীবিত আছেন। সংগ্রহের কাজে যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের নাম উল্লেখ করা যায়নি। তবে তাদের সংখ্যাও কম নয়। আদের জীবিত ও মৃত সকলের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।
শৈশবে মায়ের প্রতি নানা মাত্রিক অত্যাচার করেছি। সেসব বলে শেষ করবার নয় এবং বেলা-অবেলায় বাড়িতে মার্জিত-অমার্জিত বয়াতি, ফকির, সন্ন্যাসী বৈষ্ণব- বৈষ্ণবী, সাধু, কবিয়াল, কীর্তনীয়া, সরকার, গ্রাম্যগায়ক ও গায়িকাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি, এই সব অপ্রত্যাশিত ভিড় ভাট্টার জন্য, কখনো কখনো মায়ের কাছে নিজেকে অপরাধী ভেবেছি। তবে ওরাই ছিল আমার লোকগীতির কথক। মূলত তাদের সঙ্গে ভাববিনিময় হয়েছে, তাদের নিয়ে গান করেছি ও নিজের গান তাদের মুখে তুলে দিয়েছি। ঐ অভ্যাগতদের নিয়ে নানা ধরনের সামাজিক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। কোনো কোনো বিষয়ে প্রশাসনকেও জানাতে হয়েছে। আমার মায়ের মেজাজ বেশ গরম ছিল। তবে এই উটকো ঝামেলার জন্য সংসারকর্মী মায়ের কোপানলে কখনো পড়িনি। কারণ তিনি সঙ্গীতের লোকদের অপছন্দ করেননি। আমার মায়ের বিনম্র সহযোগিতা না থাকলে এই সংগ্রহ এত সমৃদ্ধ হতো না। আমার অক্ষর লেখার হাতেখড়ি এই মায়ের কাছে।