এমন কোনো বিদ্যাবত্তা কিংবা অতীতের বিচিত্র অভিজ্ঞতা আমার নাই যদ্বারা আমি নূতন কোনো পথের সন্ধান প্রদান করত গ্রন্থ রচনা করিতে পারি। জীবনের অধিকাংশ কাল সংগীতচর্চায় অতিবাহিত করিয়া জীবন সায়াহ্নে কোনো সত্য ও নির্বিশেষ শিল্পের পরিচয়দানে যে শক্তির প্রয়োজন তাহাও আমার নাই। অনাবিল প্রাণ বোধনার ভাবাবেগের উৎস কোথায় তাহাও জানি না। আমার বিশ্বাস এই যে, বংশীবাদক তাহার আপন বাঁশিতে ইচ্ছামতো সুর বাজাইয়া আমা হইতে আত্মবিকাশ করিয়া গিয়াছেন। এই হিসাবে আমার প্রচেষ্টা অকিঞ্চিৎকর হইলেও দোষণীয় হইবে না। ইহা দ্বারা মানুষের জ্ঞান বিকাশে আত্মশক্তি পারমাত্মিক গুণের সংস্পর্শ লাভ সম্ভবপর হইতে পারে বলিয়া আশা করা যায়।
অত্র পুস্তকে লিখিত যে সমস্ত তত্ত্ব বা তথ্য সম্বন্ধে বর্তমান ওলামা সম্প্রদায়ের মতবিরোধ সম্ভাবনা তাহাদিগকে হজরত শিবলী নুমানীর আল কালাম ও এলমুল কালাম, শাব্বির আহাম্মদ উছমানীর আকলে নকল, ইমাম গাজ্জালী সাহেবের এহিয়াউল উলুম, কিমিয়া সাহাদত ও এলমুল আলাক, শাহ ওলিউল্লার হুজ্জাতুল্লায়েল বালেগা এবং দুরুছ-ত্বয়ারিক নামক মিসরি কিতাব ও আবুল মনসুর মাতারিদী, শেখ আহাম্মদ ছারবিন্দ, ইবনে খলদুন, উমর খাইয়ম প্রমুখ মনীষীগণের লিখিত গ্রন্থাদির মর্ম অনুধাবন করিতে অনুরোধ রহিল।
হিন্দু ধর্ম বা হিন্দুশাস্ত্র সম্বন্ধে আলোচিত কথাগুলোর পশ্চাদপদ বেদান্ত- দর্শন, গীতা উপনিষদ ও পুরাণাদি তথ্য সংগ্রহে প্রভাসচন্দ্র ব্যানার্জীকৃত মহানাদ অনেকখানি সাহায্য করিয়াছে। গ্রন্থাগার সমীপে ঋণ স্বীকার করিতেছি।
এক্ষণে মন্ত্রণীত জালাল গীতিকার উভয় ভাগ যেরূপ সুধী সমাজে আদৃত হইয়াছে বিশ্ব রহস্যও অনুরূপ সৌভাগ্যের স্পর্শ লাভ করিলেই শ্রম সার্থক মনে করিব।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে সৈয়দ খোয়াজ নামক একজন ধর্মপ্রচারক পূর্ব মোমেনশাহীতে আগমন করেন এবং মদনপুর গ্রামের দুই মাইল দক্ষিণে তেঁতুলিয়া গ্রামে তাঁহার আস্তানা স্থাপন করেন। তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ ছিলেন বলিয়া সর্বত্র তিনি বুড়াপির নামে অখ্যাত হইয়াছিলেন। তেঁতুলিয়া গ্রামের নিকটস্থ মনাং গ্রামের উকিল আখ্যাধারী এক ব্রাহ্মণ পরিবারের শচীন শর্মা নামীয় এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন যাবৎ মারাত্মক অসুস্থতায় ভুগিতেছিলেন, তাঁহার জীবনের আশা প্রায় তিরোহিত হইয়া গিয়াছিল। অনন্যোপায় হইয়া তিনি পূর্বোক্ত পির সাহেবের শরণাপন্ন হন। অতঃপর তাঁহার নির্দেশিত বনজ ঔষধ সেবন ও নিয়মনিষ্ঠা পালনে তিনি সম্পূর্ণরূপে রোগমুক্ত হন এবং উক্ত পির সাহেবের প্রতি বিশেষভাবে অনুরক্ত হইয়া পড়েন, এরপর তিনি তাঁহার নিকট হইতে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হইয়া সুলতান খা নাম গ্রহণ করেন এবং তেঁতুলিয়া গ্রামেই বিবাহ করত খানেদামাদ অবস্থায় সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। মরমি গীতিকার জালাল উদ্দীন খান উক্ত সুলতান খাঁর বংশের সপ্তম উত্তর পুরুষ। তিনি ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে এপ্রিল তেঁতুলিয়া গ্রামের উত্তরস্থ আসদহাটি (সরিষাটি) গ্রামে তাঁহার মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতা ছদরুদ্দীন বা তাঁহার তৎকালীন সময়ে পর্যাপ্ত শিক্ষিত ছিলেন কিন্তু কোনো কর্মের দায়িত্ব গ্রহণ না করিয়া সর্বদা পুঁথি-পুস্তক অধ্যয়নে রত থাকিতেন। ভালো খানাপিনা গ্রহণ ও আরামে জীবনযাপনের প্রতি তাঁহার বিশেষ প্রকাতা ছিল। তিনি অত্যন্ত সদয় ও কোমলপ্রাণ ছিলেন। কাহারও দুঃখ-কষ্ট দর্শনে তাঁহার প্রাণে সহজেই করুণার উদ্রেক হইত। তজ্জন্য তাঁহার দানশীলতা সর্বত্র সুবিদিত ছিল। তিনি যখন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শকুন্তলা কিংবা নবীনচন্দ্র বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলি পাঠ করিতেন তখন সেন, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সংঘাতমূলক স্থানে পৌঁছিয়া তাঁহার নয়ন হইতে দরবিগলিত ধারে অশ্রু বর্ধিত হইত। তাহার এইরূপ অশ্রুপাতের অবশ্য একটা পশ্চাৎভূমি বিদ্যমান ছিল। জীবনে প্রথমার্ধের শেষ দিকে তিনি ছিলেন ছয় পুত্রের জনক কিন্তু ইহার কিছুদিনের মধ্যেই তাহার জ্যেষ্ঠপুত্র জালাল ভিন্ন অন্যান্য পুত্রগণ কলেরায় একের পর এক মৃত্যুবরণ করেন। তাঁহার এই পুত্র বিয়োগজনিত আঘাত তিনি জীবনে কখনও সহজভাবে গ্রহণ করিতে পারেন নাই। ছদরুদ্দীন বা তাহার জীবনের অধিকাংশ সময়ই তাহার মাতুলালয় আসদহাটি গ্রামে কর্তন করেন। কারণ এখানে তিনি মাতুল সম্পত্তি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। জালাল উদ্দীন খাঁর শৈশবকাল আসদহাটি
