গবেষণা সত্যকে নেংটা করে দিতে পারে। আবার গবেষণা সত্যকে পিছিয়ে দেবার পোশাক পরিয়ে দিতে পারে কিনা জানি না। তবে গবেষণার কাজটিকে মহানবী এতই উৎসাহিত করেছেন যে, ভেবে অবাক হই। গবেষণার আর এক নাম যদি জ্ঞান অর্জন করা বুঝায়, গবেষণার আর এক নাম যদি ঠুলি-পরা চোখ দু'টো খুলে দিতে পারা বুঝায়, গবেষণা যদি একটি চাপিয়ে দেওয়া মিথ্যার খোলস খুলে দিতে পারা বুঝায়, তাহলে সেই গবেষণার আর এক নাম জ্ঞান। নারীর অধিকার চাইবার গবেষণায় যদি প্রাচীর দাঁড় করাতে চায় ধর্মের নামে, তাহলে কি ধর্মটি মিথ্যা বলছে, না যে ধর্মের নামে ফতোয়া মারছে সে মিথ্যা বলছে? মোল্লা দিয়ে মোহাম্মদকে যাচাই যারা করতে চায় তাদের গবেষণার মাল-মসলার ভিত্তিগুলো কি নড়বড়ে না শক্ত তারও গবেষণা হওয়া উচিত মনে করি। কীভাবে মহানবীর নামে মিথ্যা কথার ঝুড়ি বানানো হয়েছে, গবেষণার মাধ্যমেই সুন্দর ধরা পড়ে এবং পড়তে শুরু করেছে। তাই মহানবী জ্ঞান অর্জনের জন্য সেই দিনের দুর্গম বলে পরিচিত চীন দেশে যাবারও উপদেশ দিয়েছেন। সেই জ্ঞান-গবেষণার মাধ্যমে কোনটা মিথ্যা আর কোনটা সত্য সেটারই সামান্য বিষয় তুলে ধরতে চেষ্টা করা হয়েছে এই ছোট বইটিতে। এই গবেষণার কাজটিকে জোর করে থামিয়ে দিয়ে গতানুগতিকতায় চলার নির্দেশ দিতে গেলেই বিবেকের গায়ে পড়ে জমিদারীর নির্মম চাবুকের আঘাত। আর তখন? তখন নকলের সাথে আসলটাও বন্যার জলের মত ভেসে যায়। উপসংহার টানে অস্বীকার। একটা চাপা বিদ্রোহ এবং ঘৃণা আর অবজ্ঞায় সমস্ত বিষয়টাকে একটা আবর্জনা মনে করে পৌর কর্পোরেশনের আবর্জনা ফেলার গাড়িতে তুলে দিয়ে নিস্তার পেতে চায়। এটাই মানব মনের একদম হালকা দর্শন। তখন আর ডেকে এনে নাস্তিক বানাতে হয় না। বরং নাস্তিক আপনিই হয়ে যায়। সব কিছুই মনে হয় তখন একটি সুপরিকল্পিত ভণ্ডামির নীল নকশা।
এই ছোট বইটিতে দেখাতে চেয়েছি আমার সীমিত গবেষণার ফসল। হয়তো কেউ ছুড়ে ফেলে দেবে, আবার কেউ হয়তো আদরে হাতে তুলে নেবে। এই স্বাধীন নির্বাচনের অধিকার যে জাতি দিতে চায় না, সেই জাতিকেই মনের অজান্তে সভ্য জাতির দুয়ারে জ্ঞান-ভিক্ষার বাসন হাতে দাঁড়াতে হয়।
মারেফতের গোপন আলাপ ॥ ১৩
ইউরোপ আর আমেরিকানরা করবে, আর নূতন নূতন মাল আবিষ্কার করবে। আমরা ওদের থেকে কিনে নেব, আর মউজ করবো। সাবাস, সাৰাস বলে চাটুকারের দল সায় দিয়ে গেছে, আর হুজুরদের দর্শনবাণী শুনিয়েছে, 'হুজুর, ওরা গাধা, খাটুনি করে মরছে ইউরোপ আর আমেরিকা। '
কিন্তু যে সকল পীর-ফকিরেরা সুফিবাদের ধারক ও বাহক, তাদের আস্তানায় গিয়ে দেখতে পেয়েছি একদম সাধারণ অবস্থা। ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই। তাও মরে-পিটে কিছু ছাপাতে গেলে বইগুলোর চেহারা-সুরত এতই নিম্নমানের হয় যে, পাঠক হাতে নিতে চায় না। যুগটাই চমকের। চমকের কিছুটা আলো বইটির চেহারায় বিউটি পারলারের উগ্র ফ্যাশনের বাঁধাই না থাক কিন্তু কিছুটা মোমপলিশ যে দিতেই হয়। যে যুগরে বাবা! বৈঠকখানায় সাজানো ফুলদানিতে থোকায় থোকায় রংবেরং-এর ফুলপাতা, একদম তরতাজা, মানে ফ্রেশ কিন্তু প্লাস্টিকের ফুল পাতা বলে যখন ধরা পড়ে তখন মনটায় একটা কামড় মারে। হযরত ইমাম বুখারী (রঃ) সাহেব তো এরকম ধোঁকাবাজি দেখতে পেলে একটিও হাদিস বিশ্বাসযোগ্য বলে গ্রহণ করতেন না। খালি ধামা দেখিয়ে গাধা ধরার কৌশল দেখে হযরত ইমাম বুখারী (রাঃ) একটিও হাদিস গ্রহণ করেন নি। বিসমিল্লাতেই ধোঁকাবাজির ম্যাজিক শো দেখে তিনি তাড়াতাড়ি বিদায় নিলেন। অথচ এ যুগে ধামার ভেতর কিছু থাক চাই না থাক, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল, ধামাটার ডিজাইন, নকশা-নমুনা এবং চেহারা-সুরতে জেল্লা মারে কিনা। নিউজ প্রিন্টের কাগজের বই, কিন্তু উপরের মলাট নামক ধামাটায় একটু জেল্লা বসাবার খায়েস থাকলেই কাজ সেরেছে। ফেল আগে মাল পানি তারপর লও বইয়ের জেল্লা। যে-না বউ তার উপর এক ডজন দাই! যুগের চাহিদা যদিও নিছক আপেক্ষিক সত্য, কিন্তু এই আপেক্ষিকতাকে কোন যুগেই ফেলে দিতে পারিনি। তাই আমরা অনেক সময় আপেক্ষিকতার উপর ভিত্তি করে সার্বিক সত্যটির উপর কসাইয়ের কুড়াল চালাই। ভাবি, মস্ত বড় একটা কাজ
করলাম।
আবার ভাষার ব্যাপারে কোলকাতার কথ্য ভাষাটাই হল হাই সোসাইটির ভাষা। প্রতিটি যুগের এলার্জির খান্দানি ধারাটি কোন না কোন কৌশলে টিকে আছেই। সংস্কৃত ভাষা কোন এক যুগে ছিল হাই সোসাইটির ভাষা। তখন কোলকাতার কথ্য ভাষা ছিল সাহিত্যের প্রশ্নে অখাদ্য। তারপর মাইকেল আর বঙ্কিম বাবুদের কাছে হাতির হাই সোসিয়াল ভাষাটি হল বারক এবং আরো কত কী যুক্তাক্ষরের ঠেলা। একদিন ফরাসিরা বিলেতের লোকদেরকে চর অঞ্চলের লোক বলে গাল দিত এবং এদের ভাষা মুখে
