পটভূমি
পৃথিবীতে বাস করেও আমরা যেমন মহাবিশ্বের খবর জানি না। পানিতে বাস করেও কাঁকড়া যেমন মহাসমুদ্রের পরিচয় জানে না, মরুর বুকে বিচরণ করেও উট যেমন মরুর দিগন্ত-প্রসারী বিশালতার খবর রাখে না, শূন্যে বিচরণ করেও বাবুই পাখী যেমন অনন্ত মহাকাশের দৈর্ঘ্য-প্রস্থের হিসাব দিতে পারে না, তেমনি মানব হয়ে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েও কেউ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সঠিক ও আসল পরিচয় জানে না। বন্ধুগণ! আমরা এ বিশ্ব মনীষার পরিচয় সম্বন্ধে যতটুকু জানতে পেরেছি বা যারা যতটুকু পরিচয় জগদ্বাসীর সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন বা ধরেছেন—এ বিশ্বগুরুর পরিচয় তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন সে পরিচয় তাঁর প্রকৃত পরিচয় নয়। তাঁর পরিচয় এর ঊর্ধ্বে— বহু ঊর্ধ্বে। পৃথিবীর মানব মন্ডলির জ্ঞানে বা যারা তাকে যতটুকু ধারণ করতে পেরেছেন; যতটুকু জানতে পেরেছেন হয়তো ততটুকুই তুলে ধরেছেন। কারণ আমরা জানি যে, প্রত্যেক জিনিসের একটা বাহ্যিক বহির্গত এবং একটি অভ্যন্তরীণ ভিতরগত দিকে রয়েছে। তেমনি আমরা যে মুহাম্মদ (সা.)-কে জানি তিনি হলেন ইতিহাসের মুহাম্মদ (সা.)। বিভিন্নভাবে নানা তথ্য উপাত্ত্বে বর্ণিত, বইপুস্তকে আলোচিত, বিভিন্ন জার্নালে এবং মুখে মুখে আমরা যে মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিচয় জেনে এসেছি তাও তাঁর সম্বন্ধে সামান্য জানা। আমরা জানি এবং মনে প্রাণে বিশ্বাস করি যে হাকিকতে মুহাম্মদ (সা.)-কে জানার ধারা রোজ কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে কিন্তু তাঁকে জানা ও চেনার আবেদন শেষ হবে না। বিশ্বজগতে পরিচয় ও প্রকাশিত মুহাম্মদ (সা.)-এর শব্দযোগে বাক্য গঠন হয় সত্য কিন্তু মনকে গঠন করে মনের নিভৃত কোণের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রকাশ করা যায় না। তাই বিশেষণ, সর্বনাম ও অব্যয় যোগেও প্রকৃত ভাব অপ্রকাশিতই থেকে যায়। যে বাক্যে এই মহামানবের পরিচয় দিতে যাব, সে বাক্যের ভাণ্ডারও সসীম ও সীমীত, যে বিশেষণে তাঁর গুণাগুণের বর্ণনা দিয়ে বিশেষিত করব তারও পরিসর ক্ষুদ্র গণ্ডিবদ্ধ। এই মহামানবের সম্মুখে সকল বাক্য ও শব্দ অপ্রতুল ও অপরিপক্ক। সে কারণেই তাঁর সম্পর্কে যা জানা, যা বলা সবই আপেক্ষিক অর্থাৎ আমরা
যে যতটুকু জানতে পেরেছি ততটুকুই প্রকাশ করেছি মাত্র। এতে আমাদের কাছে তাঁর একটা পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে সত্যি কিন্তু তা সামগ্রিক নয় বরং আপেক্ষিক। তবুও তাঁকে জানার জন্য এটা একটা প্রাথমিক উপায় একমাত্র সাধক ও প্রেমিক সত্তা ছাড়া তাঁর প্রকৃত পরিচয় সম্বন্ধে কারও তেমন ধারণা নেই। আমার মতে, সকল সাধকের পক্ষেও তাঁর আসল পরিচয় জানা সম্ভব নয়, কারণ তা একমাত্র আল্লাহপাকই ভালো জানেন। তাই বলছি-
আউয়ালুনা মুহাম্মদ
আখেরুনা মুহাম্মদ
জাহিরুনা মুহাম্মদ
বাতিনুনা মুহাম্মদ
মুহাম্মদ (সা.) এক অনন্ত সত্তা। যে সত্তার আংশিক পরিচয়ই আমরা জানতে পেরেছি। ঐ সত্তার যতটুকু উপলব্ধি সম্ভব ততটুকুর পরিচয় দিতেই আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।
সাধক জানেন শরিয়তের মুহাম্মদ এবং বিশ্বধরার বুকে প্রেরিত মহাপুরুষ নবীকে। আমরা যেহেতু ইন্দ্রিয় জ্ঞানের অধীন তাই ইন্দ্রিয় জ্ঞান দ্বারা অতিন্দ্রীয় সত্তাকে ধারণ করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। শরিয়তের মুহাম্মদ (সা.)-কে ইন্দ্রিয় জ্ঞানের দ্বারা জানতে পারলেও হাকিকতের মুহাম্মদ (সা.)-কে ইন্দ্রিয় জ্ঞানের দ্বারা উপলব্ধি করা অসম্ভব। আমরা জানি তাঁর আসল পরিচয় একমাত্র আল্লাহই জানেন। আর তিনি সন্ধানীকে ছাড়া এই পরিচয় জ্ঞাত করাবেন না। কারণ কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর গুণ ও সৌন্দর্যের প্রশংসা অব্যাহত থাকার জন্যেই আল্লাহপাক মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিচয়কে আপেক্ষিক করেছেন অর্থাৎ যারা যতটুকু তাঁর প্রেম ও মহব্বতকে হৃদয়ে ধারণ করেছেন তারা তাঁকে ততটুকুই জানতে পেরেছেন।
এই গ্রন্থে প্রখ্যাত মনীষী, গবেষক, সাধক, মহাপুরুষদের বাণীর পাশাপাশি হযরতের নিজ বাণী ও জীবন চরিতের বর্ণনাসহ মহান আল্লাহর বাণী ও নির্দেশের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। আমরা সেই আলোকে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাহ্যিক ও বংশগত পরিচয় অতি সংক্ষেপে তুলে ধরার পাশাপাশি তাঁর হাকিকি দিক সম্বন্ধে যতটুকু সম্ভব জানার চেষ্টা করব। মহান আল্লাহপাক আমাদেরকে সে তৌফিক দিন। আমীন।
বন্ধুগণ! আমরা আমাদের ক্ষুদ্র জ্ঞানের দ্বারা তাঁকে যতটুকু জানতে ও উপলব্ধি করতে সক্ষম হব তা যেন মানতে বা তাঁর যথাপযুক্ত আদব রক্ষা করতে পারি