সংগীত সাধনার অন্যতম বাদ্য-যন্ত্র হারমোনিয়াম সম্বন্ধে বিশদভাবে জানতে হলে প্রথমে সংগীতশাস্ত্র সম্বন্ধে কিছু আলোচনা করা বোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
এই বিশ্বের চারদিকে সুর ও ছন্দের রেশ বিদ্যমান। সংগীতের মতো আর কিছুই মনে আনন্দ জাগায় না। সুর ও লয় যোগে মনোমুগ্ধকারী সুর-নিবদ্ধ রাগের রূপ প্রকাশ করাই সংগীত। শাস্ত্রে গীত, বাদ্য ও নৃত্য— এই তিনটি কলার সমাবেশই হল সংগীত। কিন্তু একটা কথা জানা দরকার, গীতের অধীন বাদ্য
এবং বাদ্যের অধীন নৃত্য । সুতরাং গীতকেই প্রধান বলে ধরা হয়।
সংগীতের রূপ দুটি ধারায় বিভক্ত—মার্গ ও দেশী। প্রাচীন শাস্ত্রকারগণ তাঁদের লিখিত পুঁথিগুলোতে ‘মার্গ ও দেশী' সংগীতের উল্লেখ করলেও মার্গ সংগীত বিশেষত দেশী সংগীত নিয়েও বিশদ কিছু আলোচনা করেননি। পরবর্তীকালের শাস্ত্রকারগণ এ সম্পর্কে যথেষ্ট আলোচনা করেছেন। সে-সব আলোচনার সারমর্ম হল এই যে, দেশী সংগীতই হল সমস্ত দেশের আদি সংগীত। তাঁরা বলেন, দেশী সংগীতকে ভিত্তি করেই মার্গ সংগীতের সৌধ গড়ে উঠেছে। দেশী বা প্রচলিত সংগীতের ধারা রক্ষা করেই স্থান-কাল ভেদে রাগ-রাগিনীর পরিশোধন ও পরিবর্তন ঘটেছে। অর্থাৎ সেই সময়কার শাস্ত্রকারগণ যে সংগীতকে দেশী বা লোকসংগীত থেকে পরিশুদ্ধ বা সু-সংস্কৃত করে অর্থাৎ প্রযুক্ত বা সুশৃঙ্খল করে লোকসমাজে প্রচার করেন— পন্ডিতগণের মতে তাই 'মার্গ-সংগীত'। এক কথায়, যে সংগীত সংগীতশাস্ত্রের নিয়ম-কানুন মেনে চলে তা হল মার্গ সংগীত বা উচ্চাঙ্গ সংগীত এবং যে সংগীত জনসাধারণ আপন-আপন রুচি অনুসারে সর্বসাধারণের মনোরঞ্জনের জন্য গেয়ে থাকেন এবং যে সংগীত সংগীতশাস্ত্রের নিয়ম-কানুন মেনে চলে না—তাই-ই হল দেশী সংগীত বা লঘু-সংগীত। সংগীতশাস্ত্রের ব্যাপ্তি সীমাহীন । এই শাস্ত্র শিখে শেষ করা যায় না। তবু সুরের জ্ঞান যাতে ঠিকমত হয় সেজন্য সংগীত- শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু কিছু শাস্ত্রীয় সংগীত শিক্ষা করা দরকার। তাহলে সংগীতের বিভিন্ন শাখা, যেমন— শ্যামা সংগীত, ভজন, আধুনিক, বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন প্রভৃতিতে বিচরণ করা সহজসাধ্য হয়। ভারতীয় সংগীতে লয়, ছন্দ আর তালের যে সমন্বয় পাওয়া যায় তা পৃথিবীর অন্য কোন সংগীতের মধ্যে পাওয়া যায় না। বর্তমানে রাগ-রাগিনীর সঙ্গে পাশ্চাত্য সুরের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে নানা ধরনের মনোমুগ্ধকর সুর সৃষ্ট হয়ে শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করছে
বাংলা গানের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
একটি গান রচিত হয় কথা, সুর ও তাল মিলে। গানের কথা বলতে আমরা বুঝি ছোট কবিতার রচনা। মানুষ যে কখন থেকে গান গাওয়া শুরু করেছে তার কোন ঐতিহাসিক সন-তারিখ জানা পূর্বে মানুষের মুখে ফিরত সুর। তারপর মানুষ শিখল ভাষা, তখন তারা ভাষাকে সুরে থেকেই গানের সৃষ্টি। সে যে কবেকার কথা তা কারও জানা নেই। তবে সেটা যে থ্রাস্টের জন্মের হ
সংগীতের উৎকর্ষের পরিচয় পাওয়া যায়। খনন কালে সেখানে অনেক সংগীতদ্রব্য পাওয়া গেছে। না সিন্ধু উপত্যকায় খননের ফলে ভারতবর্ষের যে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত ছিদ্রযুক্ত বাঁশী পাওয়া গেছে। সেখানে উন্নত ধরনের চর্মাচ্ছাদিত বাদ্যযন্ত্র বীণা-সহ কয়েক ধরনের তার পাওয়া গেছে। এছাড়াও সেখানে পাওয়া গেছে নৃত্যশীল পুরুষ ও নারীমূর্তি। সে সব দেখে মনে হয় এ সিন্ধু সভ্যতায় সংগীতের যথেষ্ট উৎকর্ষ ঘটেছিল। ভারববর্ষে সংগীত বিকাশের ধারাবাহিক ইতিহাস পর যায় বৈদিক যুগ থেকে। বেদের শ্লোকসমূহ সুর ও ছন্দ সহযোগে গাওয়া হত। এই গানের নাম সামান -এই তিনটি স্বরস্থানকে অবলম্বন কর সামগান প্রথম দিকে ছিল সরল এবং তা উদাত্ত, অনুদাত্ত ও স্বরিত- গাওয়া হত। তবে কালক্রমে এই গীত ধারায় যথেষ্ট পরিবর্তন আসে। সংগীতে ব্যবহৃত স্বর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, নতুন নতুন ছন্দও গানে যোজিত হতে থাকে। সামগান তখন কতিপয় শাখায় বিভক্ত হয়। তবে ও প্রধান বিভাগ হয়ে দাঁড়ায় দুটি, যথা— অরণ্য গেয় গান ও গ্রামগেয় গান। গ্রামগেয় গান থেকেই এক গান, গান্ধর্ব গান, মার্গসংগীত প্রভৃতির বিকাশ ঘটে। সংগীতের বৈদিক যুগ সাধারণ ভাবে খ্রীপূর্ব তিন হাজার থেকে ছয়শ' সালের ভেতরকার সময়ে বিস্তৃত ছিল বলে ধরে নেওয়া হত। সেই থেকে এপি সংগীতের বিকাশের কাল পর্যন্ত ভারতবর্ষের সংগীত চর্চা নানা ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। সে সবের
আমাদের বর্তমান কালের সংগীত চর্চার প্রাসঙ্গিকতা প্রায় নেই বললেই চলে ।
ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত ভারতবর্ষে ব্যাকরণসম্মত সংগীত চর্চার মোটামুটি একটি অভিন্ন রূপ ছিল। কি এর পর থেকেই এই সংগীত উত্তর ভারতীয় ও দক্ষিণ ভারতীয়—এই দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে।
প্রচলিত প্রবন্ধ সংগীতের সংগে ইরানী ও তুর্কী সংগীত ধারায় মিশ্রণের ফলে এই ধারাদ্বয়ের সূচনা
ভারতীয় সংগীতকে হিন্দুস্তানী সংগীত ও দক্ষিণ ভারতীয় সংগীতকে কর্নাটকী সংগীত বলা হয়। সে সময়
হিন্দুস্তানী সংগীতে এই মিশ্রণ খুব প্রকট হয়ে দেখা দেয়। কর্ণাটকী সংগীত বহুলাংশে এই প্রভাব মুক্ত
থাকে।