হাদীস সম্পর্কিত প্রাথমিক আলোচনা
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيْمِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِيْنَ وَالصَّلوةُ وَالسَّلَامُ عَلَى أَشْرَنِ الْأَنْبِيَاءِ الْمُرْسَلِينَ .
পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহ্ তাআলার জন্য। দুরূদ ও সালাম তাঁর প্রিয় হাবীব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর।
হাদীস মুসলিম মিল্লাতের এক অমূল্য সম্পদ, ইসলামী শরীআতের অন্যতম অপরিহার্য উৎস এবং ইসলামী জীবন বিধানের অন্যতম মূলভিত্তি। কুরআন মাজীদ যেখানে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার মৌলনীতি পেশ করে, হাদীস সেখানে এ মৌলনীতির বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও তা বাস্তবায়নের কার্যকর পন্থা বলে দেয়। কুরআন ইসলামের প্রদীপ-স্তম্ভ, হাদীস তার বিচ্ছুরিত আলো। ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে কুরআন যেন হৃৎপিণ্ড, আর হাদীস এ হৃৎপিণ্ডের সাথে সংযুক্ত ধমনী। জ্ঞানের বিশাল ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত তাজা তপ্ত শোণিতধারা প্রবাহিত করে এর অংগ-প্রত্যংগকে অব্যাহতভাবে সতেজ ও সক্রিয় রাখে। হাদীস একদিকে যেমন আল-কুরআনুল আযীমের নির্ভুল ব্যাখ্যা দান করে, অনুরূপভাবে তা পেশ করে কুরআনের ধারক ও বাহক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র জীবন চরিত, কর্মনীতি ও আদর্শ এবং তাঁর কথা ও কাজ, হিদায়াত ও উপদেশের বিস্তারিত বিবরণ। এ জন্যই ইসলামী জীবন বিধানে কুরআনে হাকীমের পরপরই হাদীসের স্থান।
আল্লাহ্ তাআলা জিবরাঈল আমীনের মাধ্যমে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর যে ওহী নাযিল করেছেন- তাই হচ্ছে হাদীসের মূল উৎস। ওহী-এর শাব্দিক অর্থ – ইশারা করা, গোপনে অপরের সাথে কথা বলা,-(উমদাতুল কারী, ১ম খঃ পূঃ ১৪)। ওহীলব্ধ জ্ঞান দুই প্রকার। প্রথম প্রকার মৌল জ্ঞান - যা প্রত্যক্ষ গুহীর (ALL ;) মাধ্যমে প্রাপ্ত যার নাম 'কিতাবুল্লাহ্' বা 'আল-কুরআন'। এর ভাব, ভাষা উভয়ই আল্লাহর, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা হুবহু আল্লাহ্র ভাষায় প্রকাশ করেছেন। দ্বিতীয় প্রকারের জ্ঞান -যা প্রথম প্রকারের জ্ঞানের ভাষ্য এবং যা পরোক্ষ ওহীর ( ;) মাধ্যমে প্রাপ্ত; এর নাম 'সুন্নাহ' বা 'আল- হাদীস'। এর ভাব আল্লাহর, কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা নিজের ভাষায়, নিজের কথায় এবং নিজের কাজ ও সম্মতির মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। প্রথম প্রকারের ওহী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর সরাসরি নাযিল হতো এবং তাঁর কাছে উপস্থিত লোকেরা তা উপলব্ধি করতে পারত। কিন্তু দ্বিতীয় প্রকারের ওহী তাঁর উপর প্রচ্ছন্ন ভাবে নাযিল হতো এবং অন্যরা তা উপলব্ধি করতে পারত না। আখিরী নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআনের ধারক ও বাহক, কুরআন তাঁর উপরই নাযিল হয়। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর কিতাবে মানব জাতিকে একটি আদর্শ অনুসরণের ও অনেক বিধি-বিধান পালনের নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু তা বাস্তবায়নের বিস্তারিত বিবরণ দান করেননি। এর ভার ন্যস্ত করেছেন রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর। তিনি নিজের কথা-কাজ ও আচার-আচরণের মাধ্যমে কুরআনের আদর্শ ও বিধান বাস্তবায়নের পন্থা ও নিয়ম-কানুন বলে দিয়েছেন। কুরআনকে কেন্দ্র করেই তিনি ইসলামের এক পূর্ণাংগ জীবনাদর্শ ও জীবন-বিধান পেশ করেছেন। অন্য কথায়, কুরআন মাজীদের শিক্ষা ও নির্দেশসমূহ ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পন্থা অবলম্বন করেছেন- তাই হচ্ছে হাদীস। হাদীসও যে ওহীর সূত্রে প্রাপ্ত এবং তা শরীআতের মৌল বিধান পেশ করে তার প্রমাণ কুরআন ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীর মধ্যেই বর্তমান রয়েছে। মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় নবী সম্পর্কে বলেন-
অনুবাদকের কথা
সুবিখ্যাত সিহাহ সিত্তাহ বা ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থের মধ্যে সহীহ বুখারী শরীফ ও সহীহ মুসলিম শরীফ গ্রন্থ দুটি বিশুদ্ধতায় ও নানা বৈশিষ্ট্যে শীর্ষস্থানীয়। তারপর এ গ্রন্থদ্বয়ের মধ্যে কোন কোন দিক দিয়ে বুখারী শরীফকে হাদীস শাস্ত্রবিদগণ শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী বললেও কোন কোন দিক দিয়ে আবার মুসলিম শরীফকে শ্রেষ্ঠ বলেছেন। আসলে দুটি গ্রন্থই সমমর্যাদার অধিকারী ।
তবে সে যাই হোক না কেন, আরবী ভাষার গ্রন্থ হতে হাদীসের জ্ঞানার্জন করা আরবী না জানা লোকদের জন্য কোনক্রমেই সম্ভব নয়। এ কারণেই মাতৃভাষায় অনুবাদের প্রয়োজন। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থ কতিপয় প্রকাশনা হতে অনূদিত হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে মুসলিম শরীফ গ্রন্থখানা বিশুদ্ধতায় ও মর্যাদায় অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ ও শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হওয়া সত্ত্বেও তার অনুবাদ গ্রন্থের সংখ্যা খুবই কম। সে অভাব পূরণের প্রেক্ষিতে ও প্রয়োজনের তাগিদে আমার এ প্রয়াস।
মুসলিম শরীফের অত্র অনুবাদ গ্রন্থটি অত্যন্ত সহজ সরল, চলতি ও বোধগম্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে। কম শিক্ষিত পাঠক থেকে অধিক শিক্ষিত লোকগণও এ গ্রন্থ পাঠ করে হাদীসের মর্ম অনুধাবন করতে পারবে। ইমাম মুসলিম (রহ) গ্রন্থটি যেভাবে বিভিন্ন অধ্যায়ে ধারাক্রমানুসারে সাজিয়েছেন আমিও সেভাবেই সাজিয়েছি। এতে বিভিন্ন অধ্যায় সংরক্ষিত আছে। বিশেষতঃ তাকরার হাদীসসমূহ বাদ না দিয়ে মূল কিতাবের সমস্ত হাদীসই অনুবাদ করেছি। সনদের শেষ বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখিত হয়েছে এবং কিছু টীকা-টিপ্পনীরও উল্লেখ আছে। মূল মুসলিমের সাথে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে অনুবাদ করা হয়েছে। এ গ্রন্থখানা মাদ্রাসার ছাত্রদের বিশেষ উপকারে আসবে। আমার এ অনুবাদ গ্রন্থখানা পড়ে আশা করি প্রত্যেকেই উপকৃত হবেন।
একটি বিশেষ জ্ঞাতব্য বিষয় হলো, সনদের অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি শুধু অধস্তন এবং ঊর্ধ্বতন রাবীদের নামই উল্লেখ করেছি। মধ্যবর্তী রাবীদের নামোল্লেখ করিনি এবং এজন্যই বলা হয়েছে যে, অধস্তন রাবী ঊর্ধ্বতন রাবী হতে বর্ণনা করেছেন। আসলে কথাটি হবে অধস্তন রাবী মধ্যবর্তী রাবীর মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন রাবী হতে বর্ণনা করেছেন।
সাবধানতা: সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন, “মহান আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর (স্রষ্টার) উপর সন্তুষ্ট”। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ বলেন, “সাহাবায়ে কেরাম সবাই ন্যায়পরায়ণ; তুমি যাকে অনুসরণ করবে রেহাই পাবে”। মহান ও পুণ্যবান সাহাবীদের কোন বক্তব্যকে অবমূল্যায়ন বা মিথ্যা ভাবলে গুনাহগার হবে। কাজেই সাহাবীদের হাদীসের সমালোচনা করা নিষিদ্ধ। সুতরাং হাদীস শরীফ পাঠকালে কোন প্রকার গড়মিল বা অসামঞ্জস্য দেখা দিলে ব্যাখ্যা গ্রন্থের সাহায্য নেয়া উচিৎ। এতদ্ব্যতীত ফেকাহের কিতাবাদিও প্রচুর পাঠ করলে হাদীসের মর্ম অনুধাবন করা সহজতর হবে। হাদীসে কোন মাযহাবের বিপরীত কোন বর্ণনা আসলে সে মাযহাবের গ্রন্থাদি পড়ে সমাধানে পৌঁছতে হবে।
পাঠকবৃন্দের নিকট আকুল আবেদন, কোথাও ত্রুটি-বিচ্যুতি দৃষ্টিপাত হলে প্রকাশককে অবগত করালে
কৃতজ্ঞ হব।
উপসংহারে গ্রাহক ও পাঠক সমীপে আমি সকলেরই আন্তরিক শুভেচ্ছা এবং সহানুভূতি কামনা করছি।
প্রসিদ্ধ ৬ টি হাদিস গ্রন্থ
# মিশকাত শরীফ (সকল খণ্ড একত্রে)
#সহীহ মুসলিম শরীফ (সকল খণ্ড একত্রে)
#তিরমিযী শরীফ (সকল খণ্ড একত্রে)
#সুনানে ইবনে মাজাহ (সকল খন্ড একত্রে)
#আবু দাউদ শরীফ (সকল খণ্ড একত্রে)
#সুনানে নাসাঈ শরীফ (সকল খন্ড একত্রে)
