বাংলা কবিতার মূলধারা ও জালাল উদ্দীন খা
যতীন সরকার
বাংলা কবিতা তথা বাংলা সাহিত্যের কোনো ইতিহাস গ্রন্থেই কবি জালাল উদ্দীন যার নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না। আধুনিক বাংলার বিদগ্ধ কৰি বা কবিতা- অনুরাগীদের মধ্যে যাঁরা জালাল উদ্দীন খাঁর সৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত তেমন মানুষের সংখ্যাও নিশ্চয়ই বেশি নয়। সেই বিরলসংখ্যক মানুষের মধ্যেও কি এমন কাউকে পাওয়া যাবে যিনি অকুণ্ঠচিত্তে জালাল খাঁর রচনাকে বাংলা কবিতার মূলধারার অন্তর্গত বলে বিবেচনা করতে পারবেন? মনে তো হয় না।
আমরা, "শিক্ষিত" মানুষজন, আসলে কতকগুলো দুর্মর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। এগুলো 'আধুনিকতা'র কুসংস্কার। তথাকথিত আধুনিক শিক্ষাই আমাদের মস্তিষ্ককোষে সেইসব কুসংস্কার ঢুকিয়ে দিয়ে নিদারুণ মানস-প্রতিবন্ধের সৃষ্টি করেছে। সে রকম মানস-প্রতিবন্ধের দরুনই আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসকেও আমরা খণ্ডিত করে ফেলেছি, একটা খণ্ড অংশকেই সমগ্রের মর্যাদা দিয়েছি। বাংলা সাহিত্যের মূলধারা বলে আমরা ধরে নিয়েছি ইংরেজি-শিক্ষিত নাগরিক মধ্যবিত্তের সৃষ্ট সাহিত্যকে। এর বাইরে বিশাল বাংলায় গ্রামীণ কৃষিজীবী বা অন্যান্য বৃত্তিজীবীদের মধ্য থেকে উঠে এসেছেন যে-সব কবি, শতকরা নব্বুই জন মানুষ যাঁদের কবিতা বা গান তথা সাহিত্যের উপভোক্তা তাঁদের তো আমরা গণনীয়ই বিবেচনা করিনি। অথচ এঁরাই আবহমান বাংলার গণকবিতার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন। বাংলা সাহিত্যের এক অদ্ভুত ইতিহাস আমরা রচনা করেছি। এবং এ-রকম অদ্ভুতত্ত্ব কেবল সাহিত্যের ইতিহাসে নয়, অন্যত্রও। ইতিহাসে 'আধুনিক' যুগ বলে যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেটির অবস্থান যেন সকল প্রকার ধারাবাহিকতার বাইরে। দেশের মাটিতে তার কোনো শিকড় বা উৎস নেই, দেশের বাইরে থেকে আনা কলমের চারা যেন তা। এই 'আধুনিক যুগ' যেন এক 'বৃত্তহীন পুষ্প'। এ যুগের নামকরণেও, তাই, বৃন্তহীনত্বের ও ধারাবাহিকতা-বর্জনের ছাপ। আগের যুগের নামগুলো ধর্মসাম্প্রদায়িকতা-চিহ্নিত – হিন্দু-বৌদ্ধ যুগ, মুসলিম যুগ। কিন্তু এর পরের যুগটি খ্রিস্টান যুগ নয়, ব্রিটিশ যুগ বা আধুনিক যুগ। ব্রিটিশ আর আধুনিক এখানে সমার্থক।
প্রকাশকের নিবেদন
কবি জালাল উদ্দীন খাঁ-র গানের সংকলন জালালগীতিকা-র প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম খণ্ড একত্র করে জালালগীতিকা সমগ্র প্রকাশ করা হলো। জালাল গীতিকা সমগ্র প্রথম খণ্ড ১৯৪৮ সালে প্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তী খণ্ডগুলো ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে প্রকাশিত হয়। এই তিন দশকে বইগুলো একাধিকবার পুনঃমুদ্রিত হয় । অনেক আগেই জালালগীতিকা-র বিভিন্ন খণ্ডের পূর্ববর্তী সংস্করণ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ায় জালাল ইদ্দীন খাঁ-র ভক্ত ও অনুরাগী পাঠকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে বেশ তীব্রভাবে বইগুলোর চাহিদা অনুভূত হচ্ছিল। সে-শূন্যতার সুযোগ গ্রহণ করে কিছু অসাধু ব্যক্তি দেশের নানা জায়গা থেকে বিনা অনুমতিতে ও বেআইনিভাবে এ-বইগুলো পুনর্মুদ্রণ করতে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই এসব সংস্করণ নানা ধরনের আকীর্ণ--এগুলো বহু বিচ্যুতি এবং পাঠ-বিকৃতিও রয়েছে। জালালগীতিকা সমগ্র-এর বর্তমান সংস্করণে এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি ও বিকৃতি পরিহার করে জালাল উদ্দীন খাঁ-র গানগুলোর শুদ্ধ ও মূল ভাষ্য উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রেও কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হয়েছে। জালাল উদ্দীন খাঁ-র হাতে লেখা মূল পাণ্ডুলিপি সব পাওয়া যায়নি বলে। মুদ্রিত পাণ্ডুলিপির ওপরই নির্ভর করতে হয়েছে। বইটির সম্পাদনা ও ভূমিকা লেখার গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন অধ্যাপক যতীন সরকার । বইটি প্রকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে অনেকেই নানাভাবে সহায়তা করেছেন । কয়েকটি গানের মূল ভাষা উদ্ধারে দু-একজন শুভানুধ্যায়ীর সহযোগিতা ছিল অত্যন্ত মূল্যবান । অনেকেই অকুণ্ঠভাবে আমাদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। তাঁদের সবার ঋণ অপরিশোধ্য। ধন্যবাদ জানিয়ে সে ঋণ পরিশোধের চেষ্টা অবান্তর।
জালালগীতিকা-র সমগ্র যদি কবি জালাল উদ্দীন খাঁ-র ভক্ত ও অনুরাগী পাঠকদের চাহিদা পূরণ করতে পারে তাহলেই এ-উদযোগ সার্থক হবে ।