ছোটবেলা থেকে গানের পরিবেশে বেড়ে উঠেছি। একে তো ভাটি অঞ্চল, প্রায় সারা বছরই বাড়ির আশপাশে কোনো না-কোনো গানের আসর লেগেই থাকত। তাছাড়া নিজের বাড়িতেও একই অবস্থা। বড় দুই বোন ওস্তাদের কাছে গান শিখতেন। আর আমি কচি হাতে তবলা বাজাতাম । এভাবেই গানের প্রতি দুর্বলতা ।
সেই দুর্বলতা থেকে গানের প্রতি প্রেম । আর সেই প্রেমের কারণেই কলেজ জীবন থেকে এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন বাউল-ফকিরদের গানের আসর ও আখড়ায় ছুটে যাই। ছুটতে ছুটতে যা দেখতাম সেটাই ডায়েরিতে নোট করে রাখতাম। সেই ডায়েরির পাতা খুঁজে খুঁজেই এ বইয়ে সংকলিত অধিকাংশ লেখার কাঠামো তৈরি করেছি। বলা যেতে পারে, এসব লেখা এক ধরনের অভিজ্ঞতা কিংবা ভ্রমণ-বিবরণী । তবে এসব অকিঞ্চিতকর রচনায় বাংলাদেশের বাউল-ফকিরদের অতীত ও বর্তমানের নানা তথ্য তুলে ধরার একটা ক্ষীণ চেষ্টাও করা হয়েছে ।
বাউল-ফকিরদের কথা ছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিশিষ্ট বাউল-ফকির-দেহসাধকের রচিত পদাবলিও স্থান পেয়েছে । তবে এর বাইরে আরও অনেক সাধকের পদ নিশ্চয়ই রয়ে গেছে। পরবর্তী সংস্করণে সেগুলোও সংযুক্ত করার প্রত্যাশা রইল। এ ছাড়া বইটিতে কিছু আলোকচিত্রও স্থান পেয়েছে— যা থেকে বাংলাদেশের বাউল-ফকির সম্প্রদায় সম্পর্কে পাঠকদের সচিত্র ধারণা পেতে সহায়ক হবে বলে আমি মনে করি।
২০১২ সালে বইটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশের পর থেকেই পাঠকদের সাড়া ছিল অভিভূত হওয়ার মতো । তবে বছর না ঘুরতেই প্রথম সংস্করণ শেষ হওয়াটা আমার কাছে ছিল রীতিমতো বিস্ময়ের মতো । এরপর বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের ব্যাপারে অন্বেষা প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেনের অনবরত তাগাদা সত্ত্বেও সময়াভাবে তা আর আমার পক্ষে করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। বইটি পুনর্বার প্রকাশিত না-
মানুষ থাকলি আল্লা আছে, মানুষ ভজো গিয়া
তখন ইন্টারমিডিয়েট পড়ি, বন্ধুদের সঙ্গে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালনধামে গিয়েছিলাম । আজ আমরা যে লালন কমপ্লেক্স দেখছি, তখন সেখানে এত দালান- কোঠা ও চাকচিক্য ছিল না। নগরায়ণের ছোঁয়াও ততটুকু পায়নি সেটা উনিশশো নিরানব্বইয়ের কথা । আমরা ছিলাম নয় বন্ধু। সারা রাস্তা হৈ-হুল্লোড় আর বেসুরো গলায় লালনের পদ আগুড়িয়ে যখন ছেঁউড়ে পৌঁছি তখন মধ্যদিন। দুপুরের খাওয়াদাওয়ার উদ্দেশে লালনধামের ঠিক পাশের একটা ভাঙা ছাউনি আর পাটকাঠির বেড়াসংবলিত টং দোকানে ঢুকলাম ।
দোকানে ঢুকেই চোখে পড়ল একজন বয়স্ক লোক নীরবে চা পান করছেন । আমাদের দেখে আগ বাড়িয়েই কথা বললেন, 'বাপ রে, সাঁইজির কাছে আসছিস?' আমাদের কেউ-ই তাঁর কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। ফলে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ ছিলাম। তিনি যখন পুনরায় হাত জোড় করে বুকে-কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম ভঙ্গিতে বললেন, 'লালন সাঁইজি আমার মনের মধ্যে আছে রে বাপ। তোমাদের মনের মধ্যেও আছে। এরপরেই তিনি প্রশ্ন ছোড়েন, 'নাকি ভুল কলাম?' তখন আমাদের আর বুঝতে বাকি থাকে না যে—তিনি 'সাঁইজি' বলতে লালনকেই বুঝিয়েছেন ।
এভাবেই আমাদের আলাপ জমে ওঠে। এরই মধ্যে জেনে যাই—তিনি হচ্ছেন ফকির দুর্লভ শাহ। কুষ্টিয়ায় আমাদের প্রথম পরিচিত ব্যক্তি । খাওয়া শেষে তাঁকে নিয়েই ধামে ঢুকি । তিনি আমাদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সবকিছু দেখান । ২০১১ সালের অক্টোবরে লালন মৃত্যুবার্ষিকী অনুষ্ঠান দেখার জন্য যখন দ্বিতীয়বারের মতো কুষ্টিয়া যাই, তখন প্রথমেই ফকির দুর্লভ শাহের খোঁজ করি। এক বাউল-সাধুর কল্যাণে পেয়েও যাই ঠিকানা। বর্তমানে তিনি বসবাস করছেন ছেঁউড়িয়ার কারিগরপাড়ার ঠিক শেষ বাড়িটিতে ।
ফকির দুর্লভ শাহের বাড়িতে যাওয়ার রাস্তাটাও বেশ চমৎকার । যাওয়ার সময় চোখে পড়বে প্রশস্ত রাস্তা, দুপাশে সারি সারি গাছ আর তাঁতপল্লি । তবে তাঁর বাড়ির কাছাকাছি যাওয়ার পর একটু হতাশ হতে হয়। বাড়িতে ঢোকার কয়েক শ গজ আগে থেকেই কাঁচা মাটির রাস্তা। আগের রাতের সামান্য বৃষ্টিতেই হয়তো জল-কাদায় থিকথিক করছে, কাদা-মাটির দুর্গন্ধও নাকে এলো । স্যান্ডেলে-পায়ে কাদায় একাকার করে একসময় আমরা ফকির দুর্লভ শাহের ঘরে ঢুকি ।
