আমাদের এই নদীমাতৃক দেশে যে গান অধিক সংখ্যক মানুষের হৃদয় উদ্বেলিত করে তা হলো বাউল গান। হাজার বছরের ইতিহাস আর ঐতিহ্য মিশে আছে এই গানে। একতারা, দোতারা, বাঁশি আর মন্দিরার ঝংকারে যে গান সৃষ্টি হয়, যার রাখালিয়া সুরে প্রাণ ব্যাকুল করে মূলত সেটাই বাউল গান। এই গানের মাধ্যমেই মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আর করুণ আর্তনাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো সম্ভব যেটা পৃথিবীর অন্য কোনো সংগীতে সম্ভব নয়। স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়ে যে গান রচিত হয়, যা শুনলে আত্মা তৃপ্তি পায়, হয় পরিশুদ্ধ তা হলো আধ্যাত্মিক গান। এই আধ্যাত্মিক গানই বাউল গানের একটি অংশ।
আমাদের বাউল সংগীতকে যারা সমৃদ্ধ করেছেন, যাদের সৃষ্টির জাদুতে সমৃদ্ধ হয়েছে পল্লিগানের ভান্ডার আবদুস সাত্তার মোহন্ত তাদের মধ্যে অন্যতম। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। নিজে গান লিখতেন, সুর করতেন আবার নিজেই গাইতেন। শুধু নিজের লেখা গান গেয়ে যে এতটা জনপ্রিয়তা অর্জন করা যায় সেটা তিনিই প্রমাণ করেছেন। তার বহুমুখী প্রতিভার আলোকে আমাদের বাউল সংগীতের ভুবন আলোকিত হয়েছে।
মানুষের হৃদয় স্পর্শ করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার গায়কীতে। দরাজ কন্ঠ আর অপূর্ব পরিবেশনায় শ্রোতরা মুগ্ধ হতেন। গান শুনিয়ে শ্রোতাদের অঝোরে কাঁদাবার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার গায়কীতে। তার গানের সহজ বাণী আর সুরের মাধুর্য অনায়াসে মানুষের মর্মস্পর্শ করত বলে তাকে মরমি বাউল কবি বলা হয় । সংগীতের ভেতর দিয়ে তিনি আল্লাহর ধ্যান করে আধ্যাত্ম জীবনের সঙ্গে একাত্ম হতে চেষ্টা করেছেন। গুরুপ্রেম, ঐশীপ্রেম, প্রার্থনা, মুর্শিদি, দেহতত্ত্ব, আধ্যাত্মিকসহ তিনি প্রায় ৯ শতাধিক গান রচনা করেছেন। তার অমর সৃষ্টি 'আমি তো মরেই যাব' গানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশে পরিচিত। এছাড়াও তার বহু গান জনপ্রিয়তা লাভ করে। তার বেশ কিছু গান চলচ্চিত্রেও ব্যবহার করা হয়েছে।
তিনি দেখতে যেমন সুদর্শন ছিলেন বাচনেও ছিলেন মিষ্টভাষী। মানুষকে আপন করে কাছে টানার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার। সকল শ্রেণির মানুষের সাথে তিনি মিশতেন। কথা বলার সময় বিনয় যেন ঝরে পড়ত। স্নেহের ফল্গুধারা তার
আবদুস সাত্তার মোহন্ত ১৯৪২ সালের ৮ নভেম্বর মুন্সীগঞ্জ জেলার পৌছে উপজেলার কুড়িগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম গোলাম বেপারী এবং মাতা মরহুমা সবুরুন নেছা। তিনি ছিলেন গুরুপ্রেমী মানুষ। পাগল কদম আলী মস্তানের অনুপ্রেরণায় আবদুস সাত্তার মোহন্ত গান বাজা আলী মস্তানকে (রহ.) শুরু মেনে সারাটি জীবন গুরুভক্তিতে পার করেছেন শুরু করেন। কদম আলী মস্তানই তার 'মোহন্ত' নামটি প্রদান করেন। আবদুস সাত্তার মোহন্ত ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ বেতারে গান করার সুে হন। একুশে টিভিতে 'দেহতরী' এবং এনটিভিতে 'মন আমার সন্ধান ব লাভ করেন। তিনি ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত অ ধারাবাহিক অনুষ্ঠানে গান করে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
তিনি নিয়মিত বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলে গান করেছেন।
১৯৮৯ সালে তার প্রথম অডিও অ্যালবাম 'হুঁশিয়ার তোমরা হুঁশিয়ার প্রকাশি হয়। তিনি ১৯৯১ সালে বিটিভির তালিকাভুক্ত গীতিকার নির্বাচিত হন। ২০১২ সালের বইমেলায় তাঁর লেখা বেশকিছু কালজয়ী গান নিয়ে আমিহে মরেই যাব' শিরোনামে মোহস্তগীতি বইটি প্রকাশিত হয়। বইটির মো উন্মোচন করেন প্রখ্যাত কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলন। বইটি সম্পর্কে মিল ভাই বলেন, এটি শুধুমাত্র একটি বই নয়। এটি একটি কালজয়ী গানের দলিল এটিকে সংরক্ষণ করলে আমাদের বাউল সংগীতের ভান্ডার আরো সমৃদ্ধ হবে। এই গুণী সাধক ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তিনি জীবদ্দশায় গুরুশিষ্য প্রেমের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন মৃত্যুর পরে মহামিলনের আকাঙ্ক্ষায় মুর্শিদের রওজার পাশে কেরানীগঞ্জের কদমপুর ‘মঞ্জিল-এ-মোহন্তে' চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। গুরু-শিষ্যের মহামিলনে সাক্ষী হতে প্রতিদিন এখানে অসংখ্য মানুষ আসেন।
আবদুস সাত্তার মোহন্ত আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর রচিত গানগু রেখে গেছেন। তাঁর এই মরমি গানের বাণী যতদিন মানুষের মর্মস্পর্শ করা ততদিন তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। এই গানগুলো আপনাদে ভালো লাগলে এবং সমাজের অবক্ষয় রোধে যদি বিন্দুমাত্র ভূমিকা রা তাহলেই আমাদের প্রচেষ্টা সার্থক হবে।