আলফু দেওয়ানের বংশধর হিসেবে আরিফ দেওয়ানের পরিচয় দিতে পারলে গৌরবের ঘাটতি হয় না। কিন্তু আমরা আরিফ দেওয়ানকে আরিফ দেওয়ান হিসেবেই চিনি। নিজের সাধনায় তিনি সেই যোগ্যতা অর্জন করেছেন । এখন আর আলফু দেওয়ানের ছেলে মালেক দেওয়ান, তাঁর ছেলে খবির দেওয়ান, তাঁর ছেলে আরিফ দেওয়ান-এইভাবে পরিচয় দিতে হয় না । ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ থানার বামনসুরের দেওয়ানবাড়ির আরিফ দেওয়ান সংগীতের জন্য এখন দেশে- বিদেশে সমাদৃত ও নন্দিত ।
আমরা জানি যে পুরো পরিবারটিই সুফি ঘরানার অধ্যাত্ম-সাধনায় মগ্ন । আলফু দেওয়ানের আরেক ছেলে খালেক দেওয়ান এবং তাঁর ছেলে মাখন দেওয়ান সংগীত-সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছেন। মালেক দেওয়ানের ছোট ছেলে সাধন দেওয়ানও গানের জগতে বিচরণ করেছেন। আরিফ দেওয়ানের অনুজ শাকির দেওয়ানও গান রচনা ও গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত আছেন। পরিবারের অন্য সদস্যরাও গানের জগতে কম-বেশি বিচরণশীল। তবে এই প্রজন্মের আরিফ দেওয়ান গান নিয়ে যতটা অগ্রসর হয়েছে, তাতে অধ্যাত্ম-সাধনার বাইরেও একটা বিশাল গণ্ডি তিনি নির্মাণ করেছেন। এই গণ্ডি এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ভারত, লন্ডন, কানাডা, আমেরিকায় বিস্তৃত।
বিদেশে গিয়ে গান গাইলেই বড় শিল্পী হয়, আমি তেমন কথা বলছি না দেওয়ান পরিবারের শিষ্য-প্রশিষ্য দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে আছে, তাদের কাছে গুরুবার্তা পৌঁছে দিতে আরিফ দেওয়ানের গান হয়ে উঠেছে বিশ্বস্ত অবলম্বন । আরিফ দেওয়ান গান করেন, গান লেখেন, গানে সুর করেন।
'লোকে বলে আমার ঘরে নাকি চাঁদ উঠেছে', 'আঁধারে আসিবে বন্ধু', 'বাঁশীটি কে বাজালো মধুর কুঞ্জবনে', 'আমার নিশি যে পোহালো', 'চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে', ‘পূঁজিতে কি আমি পারি', 'আমি ঘর বেন্ধেছি ভাঙন নদীর পাড়ে, 'গুড্ডি কে বানাইলোরে', 'আমার জীবন যাইবার আগে'- এ ধরনের অজস্র জনপ্রিয় গানের শিল্পী হিসেবে আরিফ দেওয়ানকে সবাই চেনে, ভালবাসে । তিনি কেবল তাঁর বংশের পূর্বপুরুষদের গান গাইলেই জীবন পার করতে পারেন । কিংবা নিজের লেখা গান গাইলেই তাঁর আসর জমে উঠতে পারে । কিন্তু তিনি তা করেন না। ভক্ত-শ্রোতাদের দাবির প্রতিও তিনি যেমন সম্মান দেন, তেমনি নিজের সাংস্কৃতিক দায় পূরণে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ । তাই তিনি লালন সাঁই, হাসন রাজা, মাতাল রাজ্জাক, রজ্জব আলী দেওয়ান, কালু শাহ ফকির, বিজয় সরকার প্রমুখের গানও কণ্ঠে তুলে নেন । এই উদারতার ফলে তিনি কেবল দেওয়ান
ঘরানার বাইরে এসেও নিজের সাংগীতিক ক্ষমতার প্রকাশ ঘটাতে পারেন। আরিফ দেওয়ান হয়ে উঠেছেন সংগীতের দেওয়ান ।
বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে তিনি তালিকাভুক্ত শিল্পী ও সংগীত পরিচালক। বাংলাদেশ বেতারে একবার তাঁর সংগীত-পরিচালনার সময় উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছে। কী দরদ দিয়ে তিনি নিজের সুর শিল্পীর কণ্ঠে তুলে দেন! শিল্পীর সামর্থ্য ও যোগ্যতা বিবেচনা করে তিনি নিজের বাঁধা সুরকেও নতুন বাঁকে ফেরাতে পারেন, আমি তাঁর চাক্ষুষ সাক্ষী। এত ব্যস্ত মানুষ, এত ব্যস্ত শিল্পী, বাড়িতেও সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের ফাঁকেও তিনি আমার মতো মানুষকে পাশে বসিয়ে গানে সুর দিয়েছেন, এটি অনেক বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার বৈকি! অনুজপ্রতিম শিল্পী অণিমা মুক্তি গোমেজের কণ্ঠে তুলে দেবেন বলে পরম নিষ্ঠায় তিনি সুর বেঁধেছেন। বিচ্ছেদি সুরকে তিনি কী অবলীলায় ভেঙে ভেঙে নতুন সুর গাঁথতে পারেন, তাতে তাঁর শক্তিমত্তারই পরিচয় বহন করে। কেবল নিজের প্রতিষ্ঠা নয়, সহশিল্পী এবং পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের উত্তরণের জন্য তিনি পথ দেখাতে পারেন হৃদয়ের উদারতায় ।
বামনসুরের বিখ্যাত ধার্মিক পরিবারের সন্তান হয়েও তাঁকে ধর্মীয় গোঁড়ামির মধ্যে আবদ্ধ থাকতে দেখিনি । সকল প্রকার সংকীর্ণতা ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন বলেই তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয় নবজীবনের সুর। সংগীতই হয়ে উঠেছে তাঁর নিত্য আচরণীয় ধর্ম । তাঁর সুরে আজ জগৎ মাতে ৷
আরিফ দেওয়ানের গানের অ্যালবাম বেরিয়েছে বেশ কয়েকটি । কিন্তু তাঁর লেখা গানের বাণীর গুরুত্বও কম নয়। অনেক শিল্পীই গাইছেন তাঁর গান। অনেকেই গাইতে চান তাঁর গান। কিন্তু শিল্পীর খাতার বাইরে তো গানগুলো আসা দরকার। তেমন একটি চিন্তা থেকেই আরিফ দেওয়ানের গানগুলো প্রকাশের কথা বলেছিলাম বন্ধু শাকির দেওয়ানের কাছে । সেই ভাবনার বাস্তবায়ন দেখে আজ বড় আনন্দ হচ্ছে। মনের অজান্তে আমি কখন যে দেওয়ান পরিবারের একজন হয়ে উঠেছি, তা নিজেও টের পাইনি । ভাবতে ভালো লাগছে যে আমাদের পরিবারের বড়ভাই আরিফ দেওয়ানের গানের সংকলন হচ্ছে । এই গানের যে পাঠমূল্য আছে, এবার তা অনুধাবন করার সুযোগ হবে ।
আমার বিশ্বাস এই গ্রন্থ শ্রোতা ও পাঠকের কাছে যুগপৎ গ্রহণীয় হবে। সংকলক ও সম্পাদক শাকির দেওয়ান এবং প্রকাশক মুকুল ভাইকে অভিনন্দন জানাই । আর আরিফ ভাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞ, তাঁর সৃষ্টিকে সাধারণ্যে প্রকাশের সুযোগ