কবিয়াল বিজয়ের গান সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রকাশনা প্রসঙ্গ
ড. আশরাফ সিদ্দিকী
আমাদের বাংলা সাহিত্যের পরিধি বিপুল বিস্তৃত। কত ভাগ, উপভাগ কিংবা শাখা-উপশাখায় বিভক্ত করা চলে একে তা এক মুহূর্তে বলা কঠিন। এক কথায়, তাকে তুলনা করা যায় মহাসমুদ্রের সঙ্গে। সাহিত্যের বড়ো নিদর্শন হলো সংগীতের টেক্সট। যাকে বলা যায়, গান কিংবা গীতি। আজও আমাদের প্রাচীন সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শনগুলি গান, গীতি কিংবা গীতিকার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে। তবে কি সংগীতসাহিত্য শেষ হয়ে গিয়েছে? না, নানাভাবে নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সংগীতসাহিত্য নানা ধারায় বিভক্ত হয়েছে। চর্যাপদ আমাদের যেমন প্রাচীন সাহিত্যের নিদর্শন তেমনি গানেরও। সমসাময়িক কালে চর্যা ছাড়া আর কোনো ধরনের গান কিংবা সংগীত ছিল কি না তা জানা যায় না । সংগীতসাহিত্য থেকে আমাদের আধুনিক সাহিত্যের উৎপত্তি। তবে সংগীত তার প্রাচীন ধারায় নেই। নানা ধরনের পরিবর্তন-পরিবর্ধনের মধ্য দিয়ে আমাদের আধুনিক জনমানসের এক অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে সংগীত বর্তমান রয়েছে।
আমরা সহজে বলতে পারি, আধুনিক ধারার সংগীত ও সাহিত্যের পাশাপাশি আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার হলো চারণকবিদের গান। চারণকবিদের ব্যাপ্তি বেশ প্রসারিত। জারিগান, বাউলগান, ভাবগান, তরজাগান, সারিগান, কবিগান— সবই চারণকবিদের রচিত ও গীত গান ।
বাংলাদেশের এমন কোনো অঞ্চল নেই যে অঞ্চলে যে পর্যায়ের হোক না কেন চারণকবির জন্ম হয়নি। চারণকবিরা প্রায়ই অশিক্ষিত। আবার কিছু সংখ্যক চারণকবি আছে যাঁরা লেখাপড়া জানেন সামান্য। কিন্তু তাঁদের রচনায় রয়েছে সহজ-সরল ভাষার বুনুন তবে রচনায় ভাবের ঐশ্বর্য অনন্য। বৃহত্তর অর্থে আমরা বাউল, কবিয়াল, জারিয়াল, সারিয়াল, বয়াতি, পালাগায়ক সবাইকেই চারণকবি বলতে পারি। কিন্তু সম্প্রতি কিছু লোক গ্রামীণগানের গায়ক ও রচয়িতাদের বাউল বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। কথাটি ঠিক নয়। বাউল শব্দের বেশ কয়েকটি অর্থ। তার মধ্যে অন্যতম হলো, বাউলসাধক এবং বাউল
গানের গায়ক। এই হিসেবে গ্রাম্য গানের রচয়িতা ও গায়ক মাত্রই বাউল শিল্পী, বলা অনুচিত।
আমি সারা জীবন আবহমান বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিশে আছি সুযোগ হলেই দূর-দূরান্তের গ্রামে গিয়ে চারণকবিদের গান শুনে আসি। বড়োই মধুর সে অভিজ্ঞতা, যা বলে শেষ করা যায় না।
আশির দশকের একেবারে শেষ নাগাদ শুনেছিলাম যশোরের এক চারণকবির গান। মূলত তিনি কবিয়াল। কবিয়াল বিজয় সরকার। বিজয় সরকারের গান শোনার অভিজ্ঞতা কোনোদিন ভুলবার নয়। আশি দশকের শেষ দিকে ১৯৭৯ সালে কবিয়াল বিজয় সরকারের কবিগানের আয়োজন করেছিল বাংলা একাডেমি। সেটা ছিল ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায়। বহু কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, লোকবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও সংগীতপ্রেমী সেদিন বাংলা একাডেমি চত্বরে কবিগান শুনতে গিয়েছিলেন। আমিও সেই আসরে উপস্থিত ছিলাম। প্রচণ্ড ভিড়ে নানা বয়সের, নানা রুচির ও পেশার মানুষদের নিয়ে বিশাল আসর। একাডেমিতে কবিগানের আসর করা হয়েছিল বট গাছটির দক্ষিণ দিকে। বৃদ্ধ কবিয়াল বিজয় সরকার আসরে উঠে আসর বন্দনা করলেন। কিন্তু মানুষের কোলাহল তেমন হ্রাস পায়নি। গানের বাণীও তেমন শোনা যায় না। আসর বন্দনা হলো খুব সংক্ষেপে। কিন্তু তেমন গ্রহণযোগ্য হয়নি। কবিয়াল বিছানায় বসলেন। তাঁর দলের কে একজন যুবক গায়ের রঙ ফর্সা, গায়ে সুন্দর কেতার পাঞ্জাবি। কী যেন কী বিষয়ে আলাপ করলেন তাঁর সঙ্গে বিজয় সরকার। এরপর কবিয়াল আসরে উঠে ভূমিকা করে দু-চারটি কথা বললেন। এবার তিনি ভিন্ন রীতির গান গাইতে শুরু করলেন। সেই গানের সুরে যেন শ্রোতাদের মধ্যে গভীর রাতের নীরবতা নেমে এলো। কোথাও কারো কোনো সাড়া-শব্দ নেই। তখন বিজয়ের গানের সুরে এক অশরীরী সত্তার শক্তি। শ্রোতারা যেন বিমূঢ় ও চৈতণ্যহারা । বিজয়ের সেই গানের গায়কিতে তিনি নিজেই সময়সীমার উত্তরণ ঘটিয়ে গেলেন। রাজধানীর স্থূল শ্রোতাদের সেই হাততালির শব্দ নেই। এক-একটি গান শেষে শুনতে পাই, ব্যথায় ভরা কন্ঠ, সরকার বাবু অন মোর। যেন মনে হচ্ছে, নির্বাক অবস্থার মধ্যে সুরের সরবতসরবতা। সংগীতের মাধুর্য যে মানুষকে কেমন তন্ময় করে রাখতে পারে এমন ঘটনা কমই দেখেছি। তবে কবিয়াল বিজয়ের বেলায় তা মহাসত্য হয়ে রইল।
একেকটি গান শেষ হলে আরেকটি গান শুরু করেন বিজয়। তবে গানের প্রথম কপি স্মরণ করিয়ে দিতে থাকেন পায়ের কাছে বসে থাকা সেই ঝকমকে তরুণ। গৌরকান্তি, পরিপাটি চেহারা। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরনে। গায়ে একখানি ঘিয়ে রঙের আলোয়ান । মনে হলো, কবিয়ালের গানের মূল চাবি যেন।