মানুষটি তখন কথা বলতে পারতেন না। শুধু হাত-পা আর চোখ-মুখ নেড়ে আকার/ইঙ্গিত/ইশারায় অন্যদের সঙ্গে আন্ত-সংযোগ ঘটানোর চেষ্টা করেন। কিছু কথা যে বলেন না, তাও নয়। শত চেষ্টা করে যে এক-দুটি কথা উচ্চারণ করেন, তার নিরানব্বই ভাগই অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য। অথচ গত মাস দেড়েক আগেও তাঁর কথাবার্তায় কত সাবলীলতা ছিল। কফিলউদ্দিন সরকারের গান বইটি প্রকাশের প্রস্তুতি-পর্যায়ের মুহূর্তে তাঁর চোখে-মুখে ছিল আনন্দের ঝিলিক, মনে উদ্দীপনা। সেই বহুল প্রত্যাশিত পাণ্ডুলিপিটি এখন গ্রন্থাকারে প্রকাশ হতে চলেছে, কিন্তু তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে হার
মানলেন।
বলছিলাম কফিলউদ্দিন সরকারের কথা। বাউলসাধক দুর্বিন শাহের অন্যতম প্রধান এই শিষ্যের গানের সংকলন প্রকাশটা নতুন কোনো ঘটনা/বিষয় নয়। এর আগেও তাঁর আরও দুইটি বই প্রকাশিত হয়েছে। রত্নভাণ্ডার প্রথম খণ্ড এবং রত্নভাণ্ডার দ্বিতীয় খণ্ড নামের ওই বই দুটি ১৯৬৭ সালের ৭ নভেম্বর প্রকাশিত হয়েছে। এ বই দুটি বের হয়েছিল সুনামগঞ্জের গোলেস্তান প্রেস থেকে। পরবর্তীতে উভয় বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ ২০০৮ সালের ২৬ জুন প্রকাশিত হয়। প্রথম খণ্ডের প্রকাশক ছিলেন বাউল বিরহী কালা মিয়া এবং দ্বিতীয় খণ্ডটি সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার লিয়াকতগঞ্জ বাংলাবাজারের অপু কম্পিউটার সেন্টার থেকে প্রকাশিত হয় ।
দ্বিতীয় সংস্করণে উভয় বইয়ের মূল্য রাখা হয়েছিল ১৫০ টাকা। এই দুটি বইয়ে যথাক্রমে তাঁর ১২১ এবং ১১৯টি গান সংকলিত হয়। বই প্রকাশের আগে-পরে কফিলউদ্দিন সরকার আরও কয়েক হাজার গান রচনা করেছেন। যেগুলো কোনো সংকলনভুক্ত হয়নি। তবে এসব গানের অধিকাংশই গীতিকার কিংবা তাঁর পরিবারের কারও কাছেই সংরক্ষিত নেই। বইয়ের শেষ মুহূর্তের কাজ যখন চলছিল, তখন কফিলউদ্দিন সরকার দেহত্যাগ করলেন। তিনি স্বচক্ষে বইটি দেখে যেতে পারলেন না। ফলে সংকলনটির সম্পাদক হিসেবে আজীবনের জন্য আমার একটা চাপা আক্ষেপ/অনুতাপ রয়ে গেল।
কফিলউদ্দিন সরকারের গান নামের সংকলনটিতে আগের প্রকাশিত দুটি বইয়ের নির্বাচিত গানের পাশাপাশি আরও অগ্রন্থিত কিছু গান সংকলনভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়- বৈচিত্র্যে নানা ধরনের মোট ২৭৯টি গান পাঠকদের ভালো লাগবে বলেই ধারণা করছি।
গাইলেন, তখন বেশ সাড়া পড়ে। হালআমলের তরুণদের কাছে দ্রুত গানটি ছড়িয়ে পড়ে। তবে সালমা গানটি গাওয়ার সময় গীতিকারের নাম উল্লেখ না করে ‘সংগ্রহ' এ বিষয়টির উল্লেখ ছিল। হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। সম্ভবত এর বছর তিনেক পর কফিলউদ্দিন সরকারকে নিয়ে প্রথম আলো পত্রিকায় একবার একটা প্রতিবেদন লিখেছিলাম। সেই প্রতিবেদনে
প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন আমার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। ফোন মারফত আর ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে সকলেরই একটা জিজ্ঞাসা ছিল। এটি অনেকটা এ ধরনের : 'ক্লোজআপ তারকা সালমা গানটি গাওয়ার সময় গীতিকারের নাম যে কফিলউদ্দিন সরকার, সেটা কেন বললেন না?' পাঠকদের এ অভিযোগের বেশ পরে বিষয়টি নিয়ে কফিলউদ্দিন সরকারের সঙ্গে আমি আলাপ করেছিলাম। তিনি হেসে বলেছিলেন, 'হয়তো তিনি (সালমা) গানের "নামপদ” অংশটুকু পান নি। তাই “সংগ্রহ” বলে শুরুতে চালিয়ে নিয়েছেন। শুনেছি, শিল্পী বিষয়টি জানতে পেরে ভুলটুকু শুধরে নিয়েছেন।
মানুষটির বিনয়ী উত্তর শুনে আমি মুহুর্তেই অন্য এক কফিলউদ্দিনের সন্ধান পেলাম। কথায় কথায় সেদিন ওই গানটি আমার নোটখাতায় পুরো টুকে নিই। পরে অবশ্য এ গানটি তাঁর রত্নভাণ্ডার প্রথম খণ্ডে পাই। এর আরও কিছুদিন পরে ফুটপাত থেকে একটি গানের সংকলন কিনি। সেখানে এই গানটি অপর এক অখ্যাত গীতিকারের নামে প্রকাশিত হয়। শুধু এ গানই নয়, কফিলউদ্দিনের একাধিক গান সুনামগঞ্জের জনৈক এক সাংবাদিক অপর এক বাউল-গীতিকারের নামে চালিয়ে দিচ্ছেন বলে আমাকে কফিলউদ্দিন সরকার একাধিকবার অভিযোগ করেছিলেন। এ নিয়ে আক্ষেপ করে কফিলউদ্দিন সরকার আমাকে একটি দীর্ঘ চিঠিও লিখেছিলেন। বেশ কিছু ভুল বানান আর আঁকাবাঁকা হরফে লেখা চিঠিটি আমার সংগ্রহে রয়েছে।
চিঠিটি পড়ে বেশ খারাপ লাগে। একজন গ্রাম্য বাউল-গীতিকার দিনের পর দিন খেয়ে-না খেয়ে একনিষ্ঠভাবে সংগীত সাধনা করে আসছেন, পরম যত্নে যক্ষের ধনের মতো তাঁর গানগুলো আগলে ধরে বেঁচে রয়েছেন। সেই তাঁকেই কিনা নিজের গান বেহাতের হাত থেকে বাঁচাতে বিভিন্নজনের কাছে দারস্থ হতে হয়েছিল। পরবর্তীতে চিঠির এ ভাষা আমি ওই সাংবাদিককে জানিয়েছি ।
কফিলউদ্দিন সরকারের দাবি অনুযায়ী, তাঁর অপর আরেকটি গান মোস্তাক আহমাদ দীন সম্পাদিত কামালগীতি গ্রন্থে ছাপা হয়েছে। গানটি তাঁর ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত গানের প্রথম সংকলনে রয়েছে বলেও জানান। এবং সে-সময় বাউল-