কালিমার পরিচয় জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। কালিমার সাথে ইমান এবং ইমানের সাথে আক্বিদার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ইমানে মুজমাল ও মুফাচ্ছালসহ প্রথম নবী আদম (সা.) থেকে শুরু করে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সৃষ্টির আদি আউয়াল কালিমা থেকে সর্বশেষ কালিমা পর্যন্ত প্রত্যেকটির ভিন্ন ভিন্ন অর্থ ও গভীর তাৎপর্য রয়েছে। প্রত্যেক কালিমার দু ধরনের নির্দেশ রয়েছে। একটি শরিয়তি এবং অপরটি মারিফতি। যা অনেকেরই অজানা। এসব কালিমার ভেতরে ব্যবহৃত শব্দ ও বাক্যের আলাদা আলাদা তত্ত্ব ও রহস্য জ্ঞানের সন্ধান রয়েছে।
এ জ্ঞানের চর্চা ও শিক্ষার পথ সবার জন্য উন্মুক্ত ও অপরিহার্য হলেও আমরা নিজেদের অজ্ঞতা, দীনতা ও সংকীর্ণতার কারণে চিরকল্যাণ ও মুক্তির জ্ঞানলাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। যদিও আমরা অনেকেই নিজেদের অজান্তে এই মহান শিক্ষার কিছু কিছু বিষয় উপলব্ধি ও বাস্তবায়ন করে চলেছি। তবে মুসলিম সংখ্যাধিক্যের তুলনায় এই সংখ্যা অতি নগণ্য। এখানে আলোচনায় পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, বেশির ভাগ লোক কালিমার তাৎপর্য, গুরুত্ব ও হাকিকত সম্বন্ধে অজ্ঞ এবং আক্বিদা বিষয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে আছেন। অথচ তারা নিজেদের ভ্রান্তিকেই আঁকড়ে ধরে থাকতে চান। আল্লাহর কোরআন ও রাসুল (সা.)-এর হাদিসের সঠিক শিক্ষা ও আদর্শের অনুসরণ না করে নিজেদের ভ্রান্ত ধারণা ও বিশ্বাসের মধ্যেই ধর্মীয় জীবন পরিচালনা করতে চান। অতীব দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে যে, এদের অধিকাংশই আলেম শ্রেণি। যারা বিভিন্ন মতাদর্শের কাছে নিজেদের বিবেক, বুদ্ধি ও জ্ঞানের বিসর্জন দিয়েছে। নিজেদের জাহিরি বিদ্যার আত্ম-অহংকারে মাওলানা, মুফতি, মুহাদ্দিস, ফকীহ, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মোফাসসেরে কোরআন, যুক্তিবাদী, তর্কবাগীশ, কোকিলকণ্ঠী
ইত্যাদি নাম ও সর্বনামের ভেতর জেগে উঠেছে আত্মগর্ব, অহংকার ও দাম্ভিকতা। এসবের প্রভাবে ঢাকা পড়ে গেছে ইসলামের মূলশক্তি। তাওহিদি চেতনাবোধ, রূহানি, জিসমানি, ইমানি ও আধ্যাত্মিক শক্তির ফায়েজ, বরকত থেকে আজ ওলামা সমাজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কারণ উল্লিখিত টাইটেল ধারণকারী ব্যক্তির ভেতরে যদি বিন্দুমাত্র গর্ব ও অহংকারের প্রভাব ফুটে ওঠে তবে কোরআনের ঘোষণা মতে এবং নবীর হাদিস মতে সে নফসের ধোকায় পড়ে বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। আর এই ভ্রান্তরাই প্রকৃত পথভ্রষ্ট। তাদের প্রতি আল্লাহর লানত। আমরা এই লানত থেকে বাঁচতে
চাই।
আমাদের মধ্যে যারা তরিকতের পথের পথিক বা বিভিন্ন পীরের হাতে মুরিদ বা দরবার সংশ্লিষ্ট তারা পীরের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংস্পর্শের দ্বারা কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জন ছাড়াই নিজেদের অজান্তে এই মহান কালিমান্বয়ের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার উপলব্ধি ও বাস্তবায়ন করে চলেছি। তারা প্রত্যেকেই তরিকার মাধ্যমে কোরআন-হাদিসের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ শিক্ষা, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা এবং পীরের তালিম, উপদেশের দ্বারা আত্মশুদ্ধির পথে নিজেদের পরিচালিত করে থাকেন। এটাই আল্লাহ ও রাসুলের নৈকট্য লাভের পথ। কারণ এতে তাদের আত্মার খোরাক ও পিপাসাকে নিবৃত্তকরণের সঞ্জীবনী সুধা রয়েছে। যা প্রত্যেক প্রেমিকের প্রাণে অসীম প্রেমের প্রবাহ সঞ্চার করে। এর হাকিকত ও রহস্য জ্ঞানের আলোয় তারা আল্লাহ ও রাসুলের প্রেমের জ্যোতির্ময় শিখায় পরিণত হয়। আমিত্বের সমস্ত দম্ভ ও অহংকার চূর্ণ- বিচূর্ণ করে যেভাবে তারা বিনয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পীরের নিকট আত্মসমর্পণ করেছে তেমনিভাবে আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্যের পরীক্ষায়ও তারা উত্তীর্ণ হবে। যেদিন থেকে তারা তরিকতের পথে, পীরের হাতে বায়াত গ্রহণ করেছে, সেদিন থেকেই তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমস্ত কালিমার শিক্ষা ও কোরআন-হাদিসের বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের নির্দেশ পালন করে চলেছে।
প্রত্যেক তরিকতের ইমাম, পীর-মাশায়েখ, মুর্শিদের তরিকতের শিক্ষা, সংস্পর্শ, তালিম ও অজিফাপঞ্জির ভেতরেই কালিমার তরতিব ও মুসলিম জীবনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির যাবতীয় দিক-দর্শন রয়েছে। আমরা তরিকতের শিক্ষার প্রতি মনোযোগী হলেই কেবল মুজমাল ও মুফাচ্ছালসহ বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে কালিমান্বয়ের যে শিক্ষা ও সবকিছুর হাকিকত ও রহস্য সম্বন্ধে জানতে পারব ইনশাআল্লাহ। ইমানে