যা বলা প্রয়োজন
আমাদের সত্য সনাতন ইসলাম সার্বজনীন বা সমস্ত মানব জাতির জন্য মুক্তির বিধান। কারণ, ইসলাম মানে আমিত্বের কলুষ পরিহার করে মানবতা জাগ্রত করা তথা পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করা তথা লা-মউতে স্থিত হওয়া বা চিরঞ্জীব জগতে অধিষ্ঠিত হওয়া বা অমরত্ব লাভ করা তথা ‘ওঁম শান্তি'। এ বিধান জিন এবং ইনছানের জন্য প্রযোজ্য এবং জিন ও ইনছানের জন্যই এবাদতের শর্ত। সে এক বিশেষ এবাদত- যার দ্বারা লা-মউতে পৌঁছানো যায় তথা কেয়ামতের বাহিরে অবস্থান করা যায়। জিন, ইনছান ও আদম মূলতঃ এক বিষয় নয়। এবাদতের ক্ষেত্রে জিন ইনছান কথাটি পাবে, আর সমস্ত ফেরেশতাদের উপর হুকুম হলো আদমকে সেজদা করার জন্য বা আদমের প্রতি আত্মসমর্পণ করার জন্য। এ আত্মসমর্পণের আরবী হলো 'ইসলাম' আর আত্মসমর্পণকারীর আরবী হল মুসলমান। কাজেই ইসলাম বা ওঁম শান্তি বা স্রষ্টাতে আত্মসমর্পণ কোনো সীমাবদ্ধ জাতি গাত্রের বিষয় অবশ্যই নয়, ইহা পৃথিবীর মানব জাতির জন্য আল্লাহ বা স্ৰষ্টা প্রদত্ত বিধান বা ধর্ম। তবে যে সমস্ত লোকে শুধু মৃন্ময় মূর্তির উপাসনা করে থাকে তা চরম অজ্ঞানতা বা অন্ধত্বের ফল। ইহা প্রতীক, প্রতীক দ্বারা কি বুঝানো হচ্ছে তা জানাই হলো ধর্ম জ্ঞান, সত্যকে পাওয়া। পৃথিবীর কোনো মহাপুরুষই মৃন্ময় মূর্তির উপাসনা করেনি, করতে পারে না। বেদ বা ভাগবত গীতাতেও এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধ বাণী বিধৃত আছে। তবে চিন্ময় মূর্তির উপাসনা বা ধ্যান পৃথিবীর প্রত্যেকটি মহাপুরুষই করেছেন এবং তার বিভিন্ন সাধন প্রণালীও শিক্ষা দিয়েছেন। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণই বলে দিয়েছেন যে, 'মন্মনা ভব' মানে তুমি একমাত্র আমাতেই চিত্ত রাখ। 'মদ ভক্তো' মানে আমাকে ভক্তি কর। 'মদযাজী' মানে আমাকে পূজা কর। "মাং নমস্করু' মানে আমাকে নমস্কার কর ।
“কামৈস্তৈস্তৈতজ্ঞানাঃ প্রপদান্তেহন্যদেবতা।
তং তং নিয়মমাস্থায় প্রকৃতাঃ স্বয়া।' (ভাগবত গীতা, ৭/২০)।
অর্থাৎ- জড়জাগতিক কামনা-বাসনা দ্বারা যাদের জ্ঞান অপহৃত (অজ্ঞানতায় ডুবে আছে বা আত্মা হারিয়ে ফেলেছে) হয়েছে, তারা তাদের স্বভাব অনুযায়ী বিভিন্ন দেব-দেবীকে পূজা করে।
তরিকার দিক নির্দেশনা
বুঝতে হবে এখানে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণকেই উপাসনা করতে বলা হচ্ছে-যা চিনায় মূর্তি, তার মৃন্ময় মূর্তিকে নয়। সে সর্বযুগেই ছিল, আছে এবং থাকবে। এ চিরন্তন সত্যকে যারা ভুলে গেছে তারাই মৃন্ময় মূর্তির পূজার অবতারণা করছে তাকে যারা চিনেনি সে সমস্ত অজ্ঞ বা তামশিক প্রকৃতির লোকেরাই মূর্তির স্রষ্টা। ভাগবতে বলা হয়েছে, 'সর্ব ধর্মান পরিত্যাজ্য মামেকং শরণং ব্রজ' অর্থাৎ। সকল (লোকাচার ধর্ম বা জীবাত্মর দুনিয়ামুখী কর্ম তথা নফসে আম্মারার ধর্ম) পরিত্যাগ করে তুমি একমাত্র আমার আশ্রয় লও তথা শ্রীকৃষ্ণের গুণে গুণান্বিত হও (তাখাল্লাকু বে আখলাকিল্লাহ)। 'অহং তাং সর্বপাপোভ্যো মোক্ষয়িস্যামি মা অর্থাৎ তাহলে আমি তোমাকে সকল পাপ হতে মুক্ত করব, দুশ্চিন্তা কর না। গীতার এ বাণীর সমর্থনে কোরানে রয়েছে ? ‘ফাছকুরুনী আজকুরুকুম ওয়াশকুরুলী ওয়াল তাকফুরুন' অর্থাৎ সুতরাং আমাকে জিকির (স্মরণ) কর, আমি তোমাদেরকে জিবি (স্মরণ) করব। এবং আমার জন্য শোকর (কৃতজ্ঞ হও) কর এবং তোমরা কৃষী করিও না (সুরা বাকারা : ১৫২ আয়াত)। কারণ, স্রষ্টা প্রতিটি মহাপুরুষের মাঝেই মূর্তমান বিধায় তাদের বাকশক্তিতেই আল্লাহ বা প্রভুর কালাম প্রকাশ হচ্ছে। এখানে গভীর ভেদ-রহস্য নিহিত আছে। এক স্রষ্টার এক ধর্ম মানবাত্মার মাঝে বিকশিত হয়ে চলেছে যাকে মানবতা বলা হয়। যার মধ্যে ইনছানী আত্মা বা মানবাত্মা জম নেই, কেবল জীবাত্মার গুণ-খাছিয়তে আকণ্ঠ ডুবে আছে, তাদেরকে মানুষ বলা হয় না। এ ধরনের জীবাত্মার অধিকারী অজ্ঞানী বা অন্ধদের দ্বারাই বিভিন্ন লোকাচার ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে। এখন বিশ্বমানব-ধর্ম মানবতা হারিয়ে বহু ধর্মের সৃজন করে নিয়েছে, আর ভেদাভেদের মহাগোলে পড়ে পশুত্বের আচরণে লিপ্ত আছে তথাকথিত ধর্মের দোহাই দিয়ে। মানুষ তারাই যারা ইনছানী আত্মার অধিকারী। এ ইনছানী আত্মাকে বাংলায় বলা হয় মানবাত্মা। ইসলাম সার্বজনীন বিধান হিসাবে আল্লাহ পরিচয় ও দিদার লাভ করার জন্য সার্বজনীন পাঁচটি কর্ম রয়েছে- যা কালেন ছালাত, রোজা, হজ্জ্ব ও যাকাত নামে বিধৃত। প্রচলিত মতে পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে তিনটি গরীব লোকদের উপর ফরজ, যেমন- কালেমা ছালাত ও রোজা- এ তিনটি ; আর কালেমা, ছালাত, রোজা, হজ্জ্ব ও যাকাত- এ পঞ্চস্তম্ভ হলো ধনী লোকদের জন্য ফরজ। আসলে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভই সার্বজনীন হিসাবে সমস্ত মানুষ এবং সব শ্রেণির মানুষের উপর ফরজ- যার দ্বারা মানুষ মুক্তির দরজায় এবং আল্লাহর পরিচয় বা দিদার লাভ করবে। অজ্ঞানতার কারণে এ পাঁচটি কর্মেরও সীমাবদ্ধ ব্যাখ্যা দিয়েছে অন্ধ-অজ্ঞানীগণ। ফলে ভেদাভেদের চারি দেয়ালে আবদ্ধ হয়ে পরের সার্বজনীন বিধান ইসলাম। এ পঞ্চস্তম্ভের দু'টি দিক রয়েছে এবং তা শরিয়তে ছিল আছে। একটি জাহেরী অবস্থা- এ দিকটি ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং
রাষ্ট্রিয় পর্যায়ে রয়েছে । এদিকের সার্বিক কল্যাণ সাধন সমাধান করার জন্য কালেমা, ছালাত, রোজা, হজ্জ্ব ও যাকাতের জাহেরী বা আনুষ্ঠানিক উপাসনার ব্যবস্থা দেয়া হয়েছে। অপর দিকটি ব্যক্তি কেন্দ্রিক এবং সার্বজনীন তথা অখন্ড কালের ইবাদত। ইহা আত্মশুদ্ধি ও আত্ম পরিচয়ের দিক- বাতেনী বলে বিধৃত। এ দিকটি মানব জাতির মুক্তির এবং স্রষ্টার পরিচয়ের দিক- যা পঞ্চস্তম্ভ ভিত্তিক। এ দু'টি পথের পূর্ণাঙ্গ ওয়াকিবহাল যাদের নেই, তাদের ধর্ম নিয়ে কথা বলা উচিত নয়। এ দুটি পথই শরিয়ত হতে শুরু বিধায় শরিয়তকে যারা চিনতে পারেনি মুহাম্মদী ইসলামে তাদের ধর্ম নিয়ে কথা বলা উচিত নয়। মুহাম্মদী ইসলামে তথা সত্য সনাতন চিরঞ্জীব বিধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শরিয়ত। এ শরিয়ত মৌলবীদের রচিত শরিয়ত নয়, ইহা আল্লাহ প্রদত্ত। যা আল্লাহ প্রদত্ত শরিয়ত তা চেনা হলে খোদাকে চেনা যায়, খোদার অবস্থান ঐ শরিয়তেই নিহিত আছে। এজন্যই বীনে মুহাম্মদীর মধ্যে সব চেয়ে বড় বিষয়টি হলো শরিয়ত । অন্ধ-মূর্খরা এ শরিয়ত চিনে না-বুঝে না বিধায় তাদের মধ্য হতেই জঙ্গী মৌলবাদের আত্ম প্রকাশ হচ্ছে এবং এ শিক্ষা মাদ্রাসাতেই দেয়া হচ্ছে। যদিও মূল নীতিতে বিশ্বাস স্থাপনই মৌলবাদ বুঝায় কিন্তু তাদের সে বিশ্বাসটি নিছক অন্ধ-অনুমানের উপর স্থির হয়ে আছে। অন্ধ- অনুমানে সত্যের কিছুই লাভ হয় না- এ কথা কোৱানেই বিধৃত আছে। সেই মূল নীতিকে চেনা জানার জন্যই তরিকত, হাকিকত, মারেফত ও অহেদানিয়াত এ চারটি পথ রাছুলপাক (সাঃ) তাঁর উম্মতকে জানিয়ে দিয়েছেন এবং বেলায়েতের ভাষায় পীর মুর্শিদগণও মানব জাতিকে সে পথ বাতলিয়ে দিচ্ছেন- যার দ্বারা মানুষ ইনছানুল কামেলে পরিণত হচ্ছে এবং আল্লাহর দিদার লাভে নিজেকে ধন্য করে লা-মউতে স্থিত হচ্ছে। শরিয়ত হতে অহেদানিয়াত পর্যন্ত পাঁচটি রাহা বা পথকে যারা অস্বীকার করে তারাই হলো মৌলবাদী । মৌলবাদীগণ অন্ধ, বোবা ও বধির বিধায় মৌলবাদ হলো বিকৃত এবং থিকৃত। রাহুলের গুপ্ত তালিম হতে জানা যায় মৌলবাদীগণ শয়তানের অনুসারী। যারা বায়াতের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনেনি (সুরা ফাত্তাহ- ১০ আয়াত) তাদের ঈমান কোনো কাজেই আসবে না এবং হাশরের দিন তাদেরকে শয়তানের দল বলে ডাকা হবে এবং শয়তানের কাতারে শামিল হবার জন্য আল্লাহপাক হুকুম দিবেন (শানে হাবিবুর রহমান- ২০০ পৃষ্ঠা)। কারণ, নবুয়তের ভাষায় নবী-রাফুল আর বেলায়েতের ভাষায় পীর-মুর্শিদের নিকট বায়াত গ্রহণ করা ফরজ, যদিও অন্ধ, বোবা ও বধির মৌলবাদীগণ এ কথা মোটেও স্বীকার করতে রাজি নয়। কারণ, তারা অঙ্ক-বধির এবং বোবা। শুধু কিভাবী বিদ্যার যারা অন্ধত্ব সৃষ্টি হবেই, যার পরিণতি হাজারো মতভেদ-বন্ধ, ফতোয়াবাজি, মারামারি, অন্যায় অত্যাচার, জোর জুলুম ইত্যাদি। আর এ জন্যই এরা হলো বিকৃত